• ২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৩, বুধবার, ১৪৩৩ আশ্বিন ৮
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:০৯ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

২০২৪ সালের সংশোধনে কী কী পরিবর্তন এসেছে? —আগে কী ছিল, এখন কী হয়েছে এবং গ্রাম আদালত আসলে কী করতে পারে।

  • প্রকাশিত ১১:০৯ অপরাহ্ন বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
২০২৪ সালের সংশোধনে কী কী পরিবর্তন এসেছে? —আগে কী ছিল, এখন কী হয়েছে এবং গ্রাম আদালত আসলে কী করতে পারে।
Time Bangla news
মোঃ মিজানুর রহমান | কুমিল্লা বুরো চিফ প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ


২০২৪ সালের সংশোধনে কী কী পরিবর্তন এসেছে? —আগে কী ছিল, এখন কী হয়েছে এবং গ্রাম আদালত আসলে কী করতে পারে।

⚖️ গ্রাম আদালত কী? ২০২৪ সালের সংশোধনে কী কী পরিবর্তন এসেছে?

গ্রামের ছোটখাটো বিরোধ নিয়ে অনেক সময় মানুষকে দূরের আদালতে যেতে হয়। এতে সময়, টাকা ও পরিশ্রম—সবই বেশি লাগে।

এই ধরনের স্থানীয় বিরোধ দ্রুত ও সহজভাবে সমাধানের জন্যই বাংলাদেশে গ্রাম আদালতের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তবে ২০২৪ সালে গ্রাম আদালত আইন, ২০০৬-এ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে।


চলুন সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক—আগে কী ছিল, এখন কী হয়েছে এবং গ্রাম আদালত আসলে কী করতে পারে।

🔹 গ্রাম আদালত আসলে কী?

গ্রাম আদালত হলো ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্দিষ্ট কিছু ছোটখাটো ফৌজদারি ও দেওয়ানি বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির একটি স্থানীয় ব্যবস্থা।

এটি সাধারণ আদালতের মতো সব ধরনের মামলা বিচার করতে পারে না।

আইনের তফসিলে যে ধরনের মামলা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, মূলত সেগুলোই গ্রাম আদালতের আওতায় পড়ে।

অর্থাৎ জমি, টাকা-পয়সা, ক্ষতিপূরণ, ছোটখাটো অপরাধসহ আইনে নির্ধারিত কিছু স্থানীয় বিরোধ দ্রুত মীমাংসার জন্য গ্রাম আদালত কাজ করে।


গ্রাম আদালত আইন, ২০০৬-এর মূল উদ্দেশ্যই হলো ইউনিয়ন এলাকার নির্দিষ্ট বিরোধ সহজ ও দ্রুতভাবে নিষ্পত্তি করা। 1 


.


🔹 ২০২৪ সালের পরিবর্তনের আগে কী ছিল?


২০২৪ সালের আগে গ্রাম আদালতের আর্থিক এখতিয়ারের সীমা তুলনামূলকভাবে কম ছিল।


ফৌজদারি মামলার কয়েকটি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণের সীমা ছিল ৭৫ হাজার টাকা এবং একটি ক্ষেত্রে ছিল ৫০ হাজার টাকা।


২০২৪ সালের সংশোধনের মাধ্যমে এসব সীমা বাড়িয়ে ৩ লাখ টাকা করা হয়েছে।


অর্থাৎ গ্রাম আদালতের আর্থিক এখতিয়ার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। 2 

🔹 সবচেয়ে বড় পরিবর্তন—৩ লাখ টাকা পর্যন্ত

২০২৪ সালের সংশোধনের পর গ্রাম আদালত তফসিলের নির্দিষ্ট ফৌজদারি মামলায় সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দিতে পারে।


তবে মনে রাখতে হবে—


গ্রাম আদালত কারও কারাদণ্ড দেওয়ার আদালত নয়।


আইনে নির্ধারিত মামলায় এর ক্ষমতা মূলত ক্ষতিপূরণ এবং নির্দিষ্ট দেওয়ানি প্রতিকার দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। 

🔹 দেওয়ানি মামলায়ও বড় পরিবর্তন


২০২৪ সালের সংশোধনের পর তফসিলের দ্বিতীয় অংশ নতুনভাবে সাজানো হয়েছে।


৩ লাখ টাকা পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু দেওয়ানি বিরোধ এখন গ্রাম আদালতের আওতায় আসতে পারে।


এর মধ্যে রয়েছে—


- চুক্তি, রসিদ বা অন্য দলিলের ভিত্তিতে টাকা আদায়ের দাবি।


- অস্থাবর সম্পত্তি ফেরত পাওয়া বা তার মূল্য আদায়ের দাবি।


- জমি বেদখল হওয়ার এক বছরের মধ্যে দখল পুনরুদ্ধারের মামলা।


- অস্থাবর সম্পত্তি জবরদখল বা ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ।


- গবাদি পশু অন্যের জমিতে অনধিকার প্রবেশের কারণে ক্ষতিপূরণ।


- কৃষি শ্রমিকের বকেয়া মজুরি ও ক্ষতিপূরণ।


- স্ত্রীর বকেয়া ভরণপোষণ আদায়ের মামলা।


এখানে নির্দিষ্ট আর্থিক সীমা ও আইনের অন্যান্য শর্ত প্রযোজ্য হবে। 


.


🔹 গ্রাম আদালতে নারী সদস্যের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে


২০২৪ সালের সংশোধনে বলা হয়েছে, মামলার সঙ্গে কোনো নারীর স্বার্থ জড়িত থাকলে সংশ্লিষ্ট পক্ষ সদস্য মনোনয়নের সময় একজন নারীকে সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দেবেন।


অর্থাৎ নারীর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট মামলায় গ্রাম আদালতের গঠনে নারী সদস্য রাখার বিষয়টি আইনে স্পষ্টভাবে যুক্ত হয়েছে।


সাধারণভাবে গ্রাম আদালত একজন চেয়ারম্যান এবং উভয় পক্ষের মনোনীত দুইজন করে মোট চারজন সদস্যসহ পাঁচজন নিয়ে গঠিত হয়।

প্রত্যেক পক্ষের মনোনীত দুইজন সদস্যের মধ্যে একজন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হতে হবে। 5 

🔹 সদস্য মনোনয়ন না হলে কী হবে?


আগে সদস্য মনোনয়ন নিয়ে সমস্যা হলে গ্রাম আদালত গঠনের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারত।

২০২৪ সালের সংশোধনে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সদস্য মনোনয়ন করা সম্ভব না হলেও সেই সদস্য ছাড়া গ্রাম আদালত গঠন করে কার্যক্রম চালানো যাবে।

অর্থাৎ শুধু সদস্য মনোনয়ন নিয়ে জটিলতার কারণে আদালতের কার্যক্রম আটকে থাকবে না। 

🔹 ২:২ ভোট হলে চেয়ারম্যানের নির্ণায়ক ভোট

এটিও ২০২৪ সালের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।

চারজন সদস্য উপস্থিত থাকলে কোনো বিষয়ে ভোট ২:২ হলে সিদ্ধান্ত আটকে যাবে না।

এক্ষেত্রে চেয়ারম্যান নির্ণায়ক ভোট দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।

অর্থাৎ সমান ভোট হলে চেয়ারম্যানের casting vote সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে। 


.

🔹 মামলায় কোনো পক্ষ মারা গেলে কী হবে?

আগে চলমান মামলার কোনো পক্ষ মারা গেলে পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারত।

২০২৪ সালের সংশোধনে নতুন ধারা ১৫ক যুক্ত হয়েছে।

এখন দেওয়ানি বিরোধের মামলা চলাকালে কোনো পক্ষ মারা গেলে তার মনোনীত ব্যক্তি বা বৈধ উত্তরাধিকারী মামলায় পক্ষভুক্ত হতে পারবেন।

ফৌজদারি বিরোধের ক্ষেত্রে আবেদনকারী মারা গেলেও তার মনোনীত ব্যক্তি বা বৈধ উত্তরাধিকারী নির্দিষ্ট শর্তে মামলায় পক্ষভুক্ত হতে পারবেন।

ফলে শুধু কোনো পক্ষের মৃত্যুর কারণে মামলা থেমে যাওয়ার পরিস্থিতি কমবে। 8 

🔹 মামলার প্রক্রিয়াও দ্রুত করার চেষ্টা

গ্রাম আদালত গঠনের পর প্রথম অধিবেশন সর্বোচ্চ ১৫ দিনের মধ্যে করার বিধান রয়েছে।

সেখানে উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে বিষয় নির্ধারণ এবং আপস-মীমাংসার চেষ্টা করা হয়।

আপসের মাধ্যমে সমাধান সম্ভব হলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা শেষ করার ব্যবস্থা রয়েছে।

আর আপস না হলে মামলার শুনানি শুরু করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।


মূল আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি না হলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গ্রাম আদালত ভেঙে যাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। 


.


🔹 গ্রাম আদালত কী ধরনের সিদ্ধান্ত দিতে পারে?


ফৌজদারি মামলায়—


আইনে নির্ধারিত অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে পারে।


দেওয়ানি মামলায়—


আইনে নির্ধারিত অর্থ প্রদানের আদেশ দিতে পারে এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সম্পত্তি বা তার দখল প্রকৃত মালিককে ফেরত দেওয়ার আদেশও দিতে পারে।


তবে সব ধরনের জমি বা সম্পত্তির মামলা গ্রাম আদালতে করা যায় না।


তফসিলে যেসব বিষয় নির্দিষ্ট করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যেই এখতিয়ার সীমাবদ্ধ। 


.


🔹 গ্রাম আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে Appeal করা যায়?


হ্যাঁ, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে যায়।


গ্রাম আদালতের সিদ্ধান্ত ৩:২ ভোটে হলে সংক্ষুব্ধ পক্ষ ৩০ দিনের মধ্যে Appeal করতে পারে।


ফৌজদারি বিষয়ের ক্ষেত্রে এখতিয়ারসম্পন্ন প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এবং দেওয়ানি বিষয়ের ক্ষেত্রে সহকারী জজ আদালতে Appeal করার বিধান রয়েছে।


তবে ২০২৪ সালের নতুন ২:২ ভোটের পরিস্থিতিতে চেয়ারম্যানের নির্ণায়ক ভোটের বিধানও এখন যুক্ত হয়েছে। 

🔹 তাহলে ২০২৪ সালের মূল পরিবর্তনগুলো কী?


সহজভাবে মনে রাখুন—


- ফৌজদারি কয়েকটি মামলায় ক্ষতিপূরণের সীমা ৭৫ হাজার/৫০ হাজার টাকা থেকে ৩ লাখ টাকা হয়েছে।


- দেওয়ানি মামলার আর্থিক সীমা ও বিষয়গুলো নতুনভাবে সাজানো হয়েছে।


- নির্দিষ্ট দেওয়ানি বিরোধে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।


- বেদখল হওয়ার এক বছরের মধ্যে দখল পুনরুদ্ধারের নির্দিষ্ট মামলা গ্রাম আদালতের তফসিলে রাখা হয়েছে।


- নারীর স্বার্থ জড়িত মামলায় নারী সদস্য রাখার বিধান যুক্ত হয়েছে।


- সদস্য মনোনয়ন না হলেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গ্রাম আদালত কার্যক্রম চালাতে পারবে।


- চার সদস্যের উপস্থিতিতে ২:২ ভোট হলে চেয়ারম্যান নির্ণায়ক ভোট দেবেন।


- নতুন ধারা ১৫ক-এর মাধ্যমে পক্ষের মৃত্যু হলে মনোনীত ব্যক্তি বা বৈধ উত্তরাধিকারীর পক্ষভুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।


- “নাবালক” শব্দের পরিবর্তে আইনে “শিশু” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।


- স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সংজ্ঞাও আইনে যুক্ত করা হয়েছে।


- কিছু প্রক্রিয়াগত বিধান আরও পরিষ্কার করা হয়েছে। 

⚠️ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা


গ্রাম আদালত মানেই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে গেলেই যেকোনো মামলা সমাধান করা যাবে—এমন নয়।


কোন মামলা গ্রাম আদালতে যাবে, তার জন্য আইনের তফসিল, এখতিয়ার, সময়সীমা এবং অন্যান্য শর্ত দেখতে হবে।


বিশেষ করে জমি নিয়ে বড় ধরনের স্বত্বের বিরোধ, জটিল দেওয়ানি বিরোধ বা গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে গ্রাম আদালতের এখতিয়ার আছে কি না—তা আগে যাচাই করা জরুরি।


কারণ গ্রাম আদালতের ক্ষমতা আইন দ্বারা নির্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ। 


⚖️ শেষ কথা

গ্রাম আদালতের মূল উদ্দেশ্য হলো—

“ছোট ও স্থানীয় বিরোধ যেন দ্রুত, সহজে এবং কম খরচে সমাধানের সুযোগ পায়।”

২০২৪ সালের সংশোধনের মাধ্যমে সেই ব্যবস্থার আর্থিক এখতিয়ার বাড়ানো হয়েছে, কিছু নতুন দেওয়ানি বিষয় যুক্ত করা হয়েছে এবং আদালত গঠন ও মামলা পরিচালনার কয়েকটি নিয়ম আরও পরিষ্কার করা হয়েছে।

তাই গ্রামের কোনো বিরোধ হলে সরাসরি বড় আদালতে যাওয়ার আগে দেখে নিন—আপনার বিষয়টি গ্রাম আদালতের তফসিলের মধ্যে পড়ে কি না।

আইন জানা থাকলে অনেক সময় মামলা কোথায় করতে হবে—এই সিদ্ধান্তটিই আপনার সময় ও খরচ দুটোই বাঁচাতে পারে।


- Jahangir Hossain LLB

সর্বশেষ