*ডেঙ্গুর শুরুতেই সতর্কতা, প্রথম ২৪ ঘণ্টাই গুরুত্বপূর্ণ* ।
*জ্বরকে সাধারণ ভেবে অবহেলা নয় | তরল গ্রহণ, বিশ্রাম ও বিপজ্জনক লক্ষণে নজর জরুরি*
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ
দেশে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। হঠাৎ জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও জোড়ায় ব্যথা কিংবা দুর্বলতাকে অনেকেই সাধারণ জ্বর ভেবে ঘরে বসে থাকেন। কিন্তু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জ্বর শুরুর পর থেকেই সতর্ক থাকা জরুরি। বিশেষ করে প্রথম ২৪ ঘণ্টায় রোগীর উপসর্গ পর্যবেক্ষণ, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া পরবর্তী জটিলতা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ।
চলতি বছরে ডেঙ্গুতে এ পর্যন্ত ২০১ জনের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৭ হাজার ৩৬৭ জন। ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা না থাকায় রোগের শুরুতে সহায়ক চিকিৎসা, পর্যাপ্ত পানি ও তরল গ্রহণ এবং রোগীর অবস্থার নিবিড় পর্যবেক্ষণই চিকিৎসাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
*জ্বর এলেই অবহেলা নয়*
ডেঙ্গুর অন্যতম প্রধান লক্ষণ হঠাৎ উচ্চমাত্রার জ্বর। এর সঙ্গে তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, পেশি ও জোড়ায় ব্যথা, দুর্বলতা, বমি বা বমিভাব, ক্ষুধামন্দা এবং ত্বকে র্যাশ দেখা দিতে পারে। তবে এসব উপসর্গ থাকলেই ডেঙ্গু নিশ্চিত হয় না। তাই জ্বর শুরু হলে দ্রুত নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
*প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যা করবেন*
ডেঙ্গুর সন্দেহ হলে রোগীকে বিশ্রামে রাখতে হবে। পানিশূন্যতা ঠেকাতে অল্প অল্প করে বারবার তরল দিতে হবে। পানি, ওরস্যালাইন, ডাবের পানি, স্যুপ, লেবুর শরবত কিংবা উপযোগী ফলের রস নেওয়া যেতে পারে।
তবে রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য রোগ বিবেচনায় তরলের পরিমাণ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা ভালো।
*ব্যথানাশকে বিপদ বাড়তে পারে*
ডেঙ্গুর সন্দেহ থাকলে নিজের ইচ্ছায় ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে আইবুপ্রোফেন, ডাইক্লোফেনাক, ন্যাপ্রোক্সেন বা অ্যাসপিরিনজাতীয় ওষুধ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এ ছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিকও শুরু করা উচিত নয়।
*প্রথম দিনেই পরীক্ষা সব সময় নির্ভুল নয়*
জ্বরের একেবারে শুরুতে ডেঙ্গুর কিছু পরীক্ষায় নিশ্চিত ফল নাও আসতে পারে। রোগের সময়কাল ও উপসর্গ বিবেচনা করে চিকিৎসক এনএস১ অ্যান্টিজেন, পূর্ণ রক্ত পরীক্ষা বা অন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা দিতে পারেন।
তাই নিজের সিদ্ধান্তে পরীক্ষা করিয়ে রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা শুরু না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা জরুরি।
*শুধু প্লাটিলেট নয়, নজর পুরো শরীরে*
ডেঙ্গুতে প্লাটিলেট কমে যাওয়াকে ঘিরে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। কিন্তু শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা দিয়ে রোগীর অবস্থা নির্ধারণ করা যায় না। রক্তচাপ, নাড়ির গতি, রক্তক্ষরণের লক্ষণ, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থাও বিবেচনায় নিতে হয়।
তাই প্লাটিলেট কম দেখলেই আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীকে পর্যবেক্ষণে রাখা উচিত।
*বিপজ্জনক লক্ষণে দেরি নয়*
ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, কালো বা রক্তমিশ্রিত পায়খানা, শ্বাসকষ্ট, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব, অচেতন হওয়ার প্রবণতা কিংবা প্রস্রাব কমে যাওয়া—এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
*খাবার ও বিশ্রামও গুরুত্বপূর্ণ*
ডেঙ্গুতে ক্ষুধা কমে গেলেও রোগীকে সহজপাচ্য খাবার দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। নরম ভাত, খিচুড়ি, ডাল, স্যুপ, দই, সিদ্ধ সবজি ও উপযোগী ফল অল্প অল্প করে খাওয়ানো যেতে পারে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম প্রয়োজন।
*রোগীকে মশারির মধ্যে রাখা জরুরি*
ডেঙ্গু রোগীকে মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। আক্রান্ত ব্যক্তিকে এডিস মশা কামড়ালে ওই মশার মাধ্যমে অন্য ব্যক্তির শরীরে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই রোগীকে মশারির মধ্যে রাখা এবং ঘর ও আশপাশে মশা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ করতে হবে।
*ভেষজ চিকিৎসায় নির্ভরতা নয়*
ডেঙ্গুর সন্দেহ হলে পেঁপে পাতার রস বা কোনো ভেষজ উপায়ের ওপর নির্ভর করে চিকিৎসা নিতে দেরি করা ঠিক নয়। একইভাবে শুধু প্লাটিলেট কমেছে—এমন কারণে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া প্লাটিলেট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াও উচিত নয়।
ডেঙ্গুতে আতঙ্ক নয়, শুরু থেকেই সতর্কতা জরুরি। জ্বরের প্রথম দিন থেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ, পর্যাপ্ত তরল, বিশ্রাম এবং বিপজ্জনক লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করতে হবে। রোগীর অবস্থার অবনতি হলে ঘরে অপেক্ষা না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াই নিরাপদ।
*তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউনিসেফ।*
মতামত দিন