*তিন দিনে দুই ওষুধ কারখানায় আগুন, প্রশ্নের মুখে নিরাপত্তা।*
গাজীপুরে তিন দিনের ব্যবধানে দুটি ওষুধ কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শিল্প খাতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত ১৪ অক্টোবর টঙ্গীতে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের একটি ইউনিটে আগুন লাগার পর ১৭ অক্টোবর কালিয়াকৈরের সফিপুরে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের কারখানা। দুটি ঘটনার সময়কাল কাছাকাছি হওয়ায় এর প্রকৃত কারণ নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিশেষায়িত কিছু ওষুধ রপ্তানিতে বাংলাদেশের শুল্কসুবিধার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ ঘটনাগুলোর পেছনে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা বা পরিকল্পিত নাশকতার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তবে এখন পর্যন্ত এসব দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। অন্যদিকে শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি, রাসায়নিক পদার্থের সংরক্ষণ ও বৈদ্যুতিক ত্রুটির মতো বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
*চার ঘণ্টায় নিয়ন্ত্রণে আসে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের আগুন*
গত ১৪ অক্টোবর সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে টঙ্গীর চেরাগ আলীতে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ইউনিট-২ ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ২১টি ইউনিটের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা কাজ করেন। প্রায় চার ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
অগ্নিকাণ্ডে ওষুধ তৈরির রাসায়নিক, প্যাকেজিংয়ের অ্যালুমিনিয়াম ও রাবার সামগ্রী এবং উৎপাদনসংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ এখনো জানা যায়নি।
আগুনের সূত্রপাত নিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ ও ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, ভবনের চতুর্থ তলা থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখে কর্মীরা সতর্ক হন। তাঁর দাবি, ওই তলায় দাহ্য পদার্থ বা রাসায়নিক ছিল না এবং বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।
অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল ভবনের তৃতীয় তলায়। সেখানে দাহ্য পদার্থ ও রাসায়নিক থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তা নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়।
ঘটনার পর ১৫ অক্টোবর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানাটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়া গেলে আগুনের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
*তিন দিনের মাথায় আগুন ইবনে সিনায়*
ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের অগ্নিকাণ্ডের তিন দিন পর, ১৭ অক্টোবর বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে কালিয়াকৈরের সফিপুরে ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের কারখানায় আগুন লাগে।
কারখানার ছয়তলা ভবনের নিচতলায় হারবাল বিভাগের কাঁচামাল সংরক্ষণের স্থানে আগুনের সূত্রপাত হয়। ফায়ার সার্ভিসের ছয়টি ইউনিট প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রাথমিক হিসাবে এ ঘটনায় ওষুধ, কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি মিলিয়ে ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে আগুনের সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করা হয়নি। সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের কথা বলা হলেও বিষয়টি নিশ্চিত হতে তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
দুটি কারখানার মধ্যে সড়কপথে দূরত্ব প্রায় ২২ দশমিক ৭ কিলোমিটার। অল্প সময়ের ব্যবধানে একই জেলার দুটি ওষুধ কারখানায় আগুন লাগার বিষয়টি আলোচনায় এলেও এ ঘটনায় কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা প্রমাণিত হয়নি।
*যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কসুবিধা ঘিরে কেন আলোচনা ?*
চলতি বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের নির্দিষ্ট বিশেষায়িত ওষুধের ক্ষেত্রে শতভাগ শুল্কের বাইরে থাকার সুবিধা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়। এতে বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের জন্য সম্ভাব্য রপ্তানি সুযোগের বিষয়টি সামনে আসে।
বিশেষায়িত ওষুধের বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়লে দেশের ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যতে নতুন রপ্তানি সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারে। তবে এই সুবিধা সব ধরনের ওষুধের জন্য প্রযোজ্য কি না, কোন পণ্য এর আওতায় পড়বে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা প্রস্তুত—এসব বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এমন প্রেক্ষাপটে পরপর দুটি ওষুধ কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা কিংবা নাশকতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কিন্তু শুধু সময়ের নৈকট্য থেকে দুটি ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র বা বিদেশি কোনো পক্ষের সংশ্লিষ্টতা নির্ধারণ করা যায় না।
*তদন্ত ছাড়া নাশকতার সিদ্ধান্ত নয়*
বাংলাদেশ ডিফেন্স জার্নালের সম্পাদক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক আবু রুশদ মনে করেন, বড় ওষুধ কারখানায় ধারাবাহিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা উচিত। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়লে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ও শিল্পসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা হওয়া দরকার। তবে তাঁর বক্তব্যে উত্থাপিত সম্ভাবনাগুলো এখনো তদন্তে প্রমাণিত কোনো সিদ্ধান্ত নয়।
অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাব এনাম খান মনে করেন, পর্যাপ্ত তথ্য ছাড়া অগ্নিকাণ্ডকে নাশকতা হিসেবে বিবেচনা করে আতঙ্ক ছড়ানো উচিত নয়।
তাঁর মতে, দেশের অনেক শিল্পকারখানায় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের মান এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতিতে ঘাটতি রয়েছে। শিল্পাঞ্চলে অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম পরিচালনার উপযোগী অবকাঠামোর অভাবও বড় সমস্যা। ফলে অগ্নিকাণ্ডের কারণ নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি কারখানাগুলোকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানের আওতায় আনা জরুরি।
*শুল্কসুবিধার সঙ্গে আগুনের যোগসূত্র দেখছেন না ওষুধশিল্পের নেতা*
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বাপি) সাবেক মহাসচিব ডা. মো. জাকির হোসেন দুটি অগ্নিকাণ্ডকে আপাতত দুর্ঘটনা হিসেবেই দেখছেন। তাঁর মতে, ওষুধ উৎপাদনে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক ও দাহ্য উপকরণ ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ও প্যাকেজিং উপকরণেও ত্রুটি থাকতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কসুবিধার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আলোচনায় থাকা বিশেষায়িত ওষুধের অনেকগুলো বাংলাদেশে এখনো ব্যাপকভাবে উৎপাদিত হয় না। এসব ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করতে সময় লাগতে পারে। ফলে সম্ভাব্য রপ্তানি সুবিধার সঙ্গে সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর যথেষ্ট ভিত্তি তিনি দেখছেন না।
তবে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা বা নাশকতার সংশ্লিষ্টতা থাকলে তা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও নিরাপত্তা সংস্থার বলে মনে করেন তিনি।
*এখন নজর তদন্তের ফলাফলে*
দুটি অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে প্রমাণভিত্তিক তদন্তই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের ঘটনায় আগুনের সূত্রপাতের স্থান ও দাহ্য পদার্থের উপস্থিতি নিয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে যে পার্থক্য রয়েছে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক সংযোগ, রাসায়নিক সংরক্ষণের ব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, জরুরি সতর্কসংকেত এবং কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কসুবিধা বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনার সঙ্গে সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা অনুমান নয়—তদন্তের তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করতে হবে।
মতামত দিন