*দেশীয় ন্যানো ইউরিয়ায় কৃষিতে খরচ কমানোর নতুন সম্ভাবনা।*
*উপশিরোনাম:* প্রতি বিঘায় সার খরচ ৯৫ শতাংশ কমানোর সম্ভাবনা, ইউরিয়া আমদানির চাপ ও পরিবেশদূষণ হ্রাসে নতুন আশা; গবেষণাগার পেরিয়ে বাণিজ্যিক উৎপাদনের পথে দেশীয় উদ্ভাবন।
কৃষিতে উৎপাদন ব্যয় কমানো, রাসায়নিক সারের অপচয় রোধ এবং আমদানিনির্ভরতা হ্রাস—তিন ক্ষেত্রেই নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে বাংলাদেশের উদ্ভাবিত ন্যানো ইউরিয়া। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) এক গবেষকের উদ্ভাবিত এই বিশেষ তরল সারের পেটেন্ট অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ পেটেন্ট অফিস। সংশ্লিষ্টদের আশা, যথাযথ পরীক্ষা, বাণিজ্যিক উৎপাদন ও কৃষকপর্যায়ে প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে দেশের কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
দীর্ঘ পাঁচ বছর দুই মাসের যাচাই-বাছাই শেষে গত ২৫ অক্টোবর ন্যানো ইউরিয়ার পেটেন্ট অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রযুক্তিটির উদ্ভাবক যবিপ্রবির কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ন্যানোটেকনোলজি গবেষক ড. মো. জাভেদ হোসেন খান। তাঁর উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তি ইতোমধ্যে দেশীয় গবেষণাগারের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরীক্ষার সুযোগ পেয়েছে।
*বিঘাপ্রতি খরচ কমতে পারে ৯৫ শতাংশ*
প্রচলিত ইউরিয়া সার ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হলো অপচয়। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, জমিতে প্রয়োগ করা দানাদার ইউরিয়ার উল্লেখযোগ্য অংশ গাছের কাজে লাগে না। প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সার বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় নষ্ট হয়ে যাওয়ায় উদ্ভিদ কার্যকরভাবে পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে তুলনামূলক কম।
অন্যদিকে, ন্যানো ইউরিয়া তরল আকারে স্প্রে মেশিনের মাধ্যমে সরাসরি গাছের পাতায় প্রয়োগ করা হয়। অতি ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে উদ্ভিদ দ্রুত নাইট্রোজেন গ্রহণ করতে পারে। উদ্ভাবকের দাবি, এ পদ্ধতিতে সারের কার্যকারিতা ৯০ শতাংশের বেশি হতে পারে।
উদ্ভাবক ড. জাভেদ হোসেন খানের দেওয়া অর্থনৈতিক হিসাব অনুযায়ী, প্রচলিত পদ্ধতিতে এক বিঘা জমিতে ইউরিয়া সার প্রয়োগে যেখানে প্রায় ৪ হাজার ২০০ টাকা ব্যয় হয়, সেখানে সমপরিমাণ জমিতে ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারে খরচ হতে পারে মাত্র ২৩০ টাকা। অর্থাৎ এই প্রযুক্তি প্রত্যাশিত কার্যকারিতা ধরে রাখতে পারলে সার বাবদ কৃষকের ব্যয় প্রায় ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
তবে বিভিন্ন ফসল, মাটি ও আবহাওয়াভেদে এর কার্যকারিতা এবং প্রচলিত সারের সঙ্গে তুলনামূলক ফলন আরও বিস্তৃত ও স্বাধীন মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
*আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকি কমানোর সুযোগ*
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৩০ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সারের চাহিদা রয়েছে। এর বড় অংশ আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ তৈরি হয়। কৃষকদের সাশ্রয়ী দামে সার সরবরাহ করতে সরকারকে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ভর্তুকি দিতে হয়।
ন্যানো ইউরিয়া প্রযুক্তি দেশীয়ভাবে বাণিজ্যিক উৎপাদনে নেওয়া সম্ভব হলে এই ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে প্রচলিত ইউরিয়ার ব্যবহার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রতিস্থাপন করা গেলে আমদানির চাপ ও সরকারি ভর্তুকি—দুই ক্ষেত্রেই সাশ্রয় আসতে পারে।
তবে এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটির উৎপাদন সক্ষমতা, বাজারমূল্য, সংরক্ষণব্যবস্থা, কৃষকের গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রচলিত সারের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
*পরিবেশবান্ধব কৃষির সম্ভাবনা*
ন্যানো ইউরিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিবেশ সুরক্ষা। প্রচলিত ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে মাটি ও পানি দূষণের পাশাপাশি নাইট্রাস অক্সাইডের মতো শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ঝুঁকি থাকে।
গবেষকদের মতে, পাতায় সরাসরি পুষ্টি সরবরাহের মাধ্যমে নাইট্রোজেনের অপচয় কমানো গেলে মাটিতে অতিরিক্ত সার জমা হওয়া এবং পানিতে নাইট্রোজেন মিশে যাওয়ার ঝুঁকিও কমতে পারে। ফলে কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবেশের ওপর চাপ কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিটি কার্যকরভাবে মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ক্ষুধামুক্তি ও টেকসই কৃষি-সংক্রান্ত লক্ষ্য অর্জনেও সহায়ক হতে পারে।
*সাত বছরের গবেষণার স্বীকৃতি*
যবিপ্রবির ন্যানো-বায়ো অ্যান্ড অ্যাডভান্সড মেটেরিয়ালস ইঞ্জিনিয়ারিং (ন্যাম) ল্যাবে ২০১৯ সাল থেকে এ প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন অধ্যাপক ড. জাভেদ হোসেন খান। দীর্ঘ গবেষণার পর উদ্ভাবিত প্রযুক্তিটির স্বত্ব সংরক্ষণের জন্য ২০২১ সালে পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরে আবেদন করা হয়।
অবশেষে গত ২৫ অক্টোবর পেটেন্ট অনুমোদনের মাধ্যমে উদ্ভাবনটির স্বীকৃতি মেলে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, যশোরের আব্দুলপুর, বগুড়ার শেরপুর ও গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নানা ধরনের ফসলের ওপর ন্যানো ইউরিয়ার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়েছে। এসব পরীক্ষায় ইতিবাচক ফল পাওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রেও প্রযুক্তিটি বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রযুক্তিটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরিতে দেশটির জৈবসার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কোলাবায়োর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার চুক্তি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
*এখন বড় চ্যালেঞ্জ বাণিজ্যিক উৎপাদন*
পেটেন্ট পাওয়া উদ্ভাবনের স্বত্ব নিশ্চিত করলেও কৃষকের হাতে প্রযুক্তিটি পৌঁছানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য প্রয়োজন শিল্পপর্যায়ে উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, সরকারি অনুমোদন এবং কৃষকদের মধ্যে এর ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে দেশীয় সার কারখানা কিংবা কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ন্যানো ইউরিয়ার বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করা যেতে পারে। পাশাপাশি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে কৃষকদের সঠিক মাত্রা ও প্রয়োগপদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।
কারণ প্রযুক্তিটির সম্ভাব্য সাশ্রয় বাস্তবে পেতে হলে প্রচলিত ইউরিয়ার পরিবর্তে কোন ফসলে কতটুকু ন্যানো ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হবে, তা বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।
*যবিপ্রবি উপাচার্যের প্রতিক্রিয়া*
ন্যানো ইউরিয়ার পেটেন্ট অর্জনকে বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের জন্য গৌরবের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন যবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর। তাঁর মতে, এই উদ্ভাবন কৃষিতে উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং আমদানিনির্ভরতা হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
উদ্ভাবক ড. জাভেদ হোসেন খান ২০২৫ সালে বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের ফেলো নির্বাচিত হন। তিনি বলেন, কৃষকের আর্থিক সাশ্রয় এবং পরিবেশ সুরক্ষার স্বার্থে উদ্ভাবিত প্রযুক্তিটি দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সরকারিহি সহযোগিতা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে ন্যানো ইউরিয়া দেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। ভবিষ্যতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিপণ্যের নতুন অবস্থান তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
মতামত দিন