• ২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৬, রবিবার, ১৪৩৩ ভাদ্র ২২
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:০৯ পূর্বাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

'হাম নিয়ন্ত্রণে এখন শুধু টিকাই যথেষ্ট নয়’

  • প্রকাশিত ১১:০৯ পূর্বাহ্ন রবিবার, সেপ্টেম্বর ০৬, ২০২৬
'হাম নিয়ন্ত্রণে এখন শুধু টিকাই যথেষ্ট নয়’
Time Bangla news
মো: মিজানুর রহমান।কুমিল্লা জেলা চিফ প্রতিনিধি। টাইম বাংলা নিউজ

দেশে বর্তমানে হামের যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা নিয়ন্ত্রণে এখন শুধু টিকাদান কর্মসূচি যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ। তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের পাশাপাশি দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, আক্রান্তদের চিকিৎসা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

হাম পরিস্থিতি নিয়ে দৈনিক কালবেলার করা এক প্রশ্নের উত্তরে এসব কথা বলেন অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ।

গত ১৫ মার্চ থেকে নিয়মিত হাম পরিস্থিতির প্রতিবেদন প্রকাশ শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। দৈনিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গত সাড়ে পাঁচ মাসের বেশি সময়েও সংক্রমণের ধারায় স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ আসেনি। বরং জুন ও জুলাইয়ে কিছুটা কমার পর আগস্ট মাসে ফের বেড়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত সর্বশেষ হিসাব বলছে, দেশে হাম উপসর্গে মোট মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ৯৮৭ জনে। এর মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু ৯৯ এবং সন্দেহজনিত মৃত্যু ৮৮৮। একই সময়ে সন্দেহজনক রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ লাখ ৬২ হাজার ২৬২ জন। এ ছাড়া পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত ১৯ হাজার ৫৬৭ জনের। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার ৪৫৩ জন; সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৫০ জন।



যদিও হামের সংক্রমণ করে গিয়েছিল। তবে আগস্টে ফের বাড়তে শুরু করে হামের প্রাদুর্ভাব। গত জুলাইয়ে সন্দেহজনক ও নিশ্চিত রোগী মিলিয়ে মোট আক্রান্ত ছিল ৩১ হাজার ৩২৭ জন। আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ হাজার ৯৩৪ জনে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও ২৬ হাজার ৩৬০ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৭ হাজার ৪৫৮। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, জুলাইয়ে ১১৯ জনের মৃত্যুর বিপরীতে আগস্টে মৃত্যু হয়েছে ১৩৬ জনের। টিকাদান কর্মসূচির পর সাময়িক স্বস্তি এলেও সংক্রমণের শৃঙ্খল পুরোপুরি ভাঙা যায়নি। আর সেপ্টেম্বরের শুরুতেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। গতকাল শুক্রবারও নতুন আরও ১ হাজার ১১৪ শিশু হামজনিত সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে এসেছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু একবার জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি প্রয়োজন। পাশাপাশি কমিউনিটি লেভেলে রোগটির বিস্তার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে এবং টিকার আওতায় নিয়ে আসতে হবে দেশের অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে। এ জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের তালিকা তৈরি করে টিকা প্রয়োগের পাশাপাশি দ্রুত পরিস্থিতির পরিবর্তনের জন্য অন্তত ১৫ বছর বয়সী শিশুদের টিকার আওতায় আনতে হবে।

অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, হাম নিয়ন্ত্রণে এখন আর শুধু টিকা যথেষ্ট নয়। প্রথম কাজ হলো প্রকৃত শিশু জনসংখ্যার নির্ভুল তালিকা তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, বাদ পড়া শিশুদের ঘরে ঘরে খুঁজে টিকা দিতে হবে। তৃতীয়ত, ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের জন্য সংক্রমণ প্রতিরোধে পরিবার ও হাসপাতালভিত্তিক বিশেষ ব্যবস্থা করা। একই সঙ্গে মাস্ক, হাত ধোয়া, আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত আলাদা রাখা, হাসপাতালের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত পরীক্ষা এবং শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেন-আইসিইউ নিশ্চিত করা।

তিনি বলেন, হামের গাফিলতি খুঁজতে রাজনৈতিক দোষারোপের বাইরে গিয়ে একটি স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। কখন টিকার ঘাটতি তৈরি হলো, কে সতর্ক করেছিল, কেন ক্রয়প্রক্রিয়া বদলানো হলো, কেন সময়মতো টিকা আসেনি, প্রকৃত টিকা কভারেজ কত এবং এত শিশুর মৃত্যুতে চিকিৎসা ব্যবস্থার কোথায় ব্যর্থতা ছিল—প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ্যে আসা জরুরি। কারণ হাম এমন একটি রোগ, যার বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা বহু বছর ধরেই রয়েছে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, দেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু টিকাদানের ঘাটতির ফল নয়; এর পেছনে দীর্ঘদিনের ইমিউনিটি গ্যাপেরও বড় ভূমিকা আছে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে কোনো শিশু বাদ পড়লে কয়েক বছর পর সেই শিশুর পাশাপাশি একই বয়সী আরও অনেক টিকাবঞ্চিত শিশু মিলে একটি বড় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী তৈরি হয়। তখন হাম ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়। জাতীয় পর্যায়ে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু একটি ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। প্রকৃতপক্ষে কত শিশু টিকার বাইরে রয়েছে, তা নির্ভুলভাবে শনাক্ত করে তাদের টিকার আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিও শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি টিকার সরবরাহে কোনো ঘাটতি রাখা যাবে না। সেই সঙ্গে মাইক্রো লেভেলে খুঁজে খুঁজে শিশুদের টিকার আওতায় আনতে হবে। এবং ৫ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত শিশুদের হাম প্রতিরোধে টিকার আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

তিনি বলেন, হামে মৃত্যুর ক্ষেত্রে অপুষ্টি, নিউমোনিয়া ও অন্যান্য জটিলতাও বড় ভূমিকা রাখে। তাই টিকার পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্তকরণ, যথাযথ চিকিৎসা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। একই সঙ্গে এত বেশি মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে প্রতিটি সন্দেহজনক শিশুমৃত্যুর ডেথ রিভিউ বা হামজনিত মৃত শিশুর হাম শনাক্তকরণ পরীক্ষা করতে হবে।

একসময় হাম নিয়ন্ত্রণে সাফল্যের আন্তর্জাতিক উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হতো। অথচ সেই দেশেই চলতি বছর হামে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় এক হাজার শিশু। কার্যকর টিকা থাকা সত্ত্বেও হাম এখন দেশের অভিভাবকদের কাছে নতুন করে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দীর্ঘ সময় টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে টিকা সংগ্রহের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের কারণে হাম প্রতিরোধে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের মতে, সময়মতো ও পর্যাপ্ত টিকা নিশ্চিত করতে না পারার খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের শিশুরাই। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশব্যাপী জরুরি টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার উদ্যোগ নেয়। সরকারের দাবি, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ১০৩ শতাংশ বেশি টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে এরপরও থামছে না হামের বিস্তার। প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৬ শিশুর মৃত্যু হচ্ছে হাম ও এর জটিলতায়। একই সময়ে হাম বা হামজনিত জটিলতা নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছে এক হাজারেরও বেশি শিশু।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনা কম। টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে হামের প্রাদুর্ভাব আগামী কয়েক মাসও দেশজুড়ে অব্যাহত থাকতে পারে।



  

সর্বশেষ