• ২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৯, বুধবার, ১৪৩৩ ভাদ্র ২৫
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৩:০৯ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

জাতীয় ঐক্যে মাও সেতুংয়ের চিন্তাধারা অনুসরণের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেন সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী

  • প্রকাশিত ০৩:০৯ অপরাহ্ন বুধবার, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০২৬
জাতীয় ঐক্যে মাও সেতুংয়ের চিন্তাধারা অনুসরণের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেন সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী
টাইম বাংলা নিউজ
বিশেষ প্রতিনিধি : মোঃ সাখাওয়াৎ হোসেন


জাতীয় ঐক্যে মাও সেতুংয়ের চিন্তাধারা অনুসরণের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেন সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী

দুর্নীতি নির্মূল, সামাজিক পরিবর্তন ও জনসম্পৃক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনে মাওয়ের চিন্তাধারা নিয়ে বিশ্লেষণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: মোঃ সাখাওয়াৎ হোসেন

জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করা, দুর্নীতি মোকাবিলা এবং সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে মাও সেতুংয়ের রাজনৈতিক ও দার্শনিক চিন্তাধারা থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন লেখক ও গবেষক সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী।

এক বিশদ বিশ্লেষণে তিনি বলেন, দেশের প্রচলিত রাষ্ট্রকাঠামো, ঔপনিবেশিক আমলের আইন ও সামাজিক ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত স্বার্থ, পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনের দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়ার মানসিকতা যতদিন থাকবে, ততদিন দুর্নীতি নির্মূল করা কঠিন হবে। তাঁর মতে, রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনৈতিক অঙ্গনে সুযোগসন্ধানী আমলা, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিকদের প্রভাব জনগণের মধ্যে হতাশা বাড়াচ্ছে।

সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী তাঁর লেখায় আধুনিক চীনের রাজনৈতিক ইতিহাসে মাও সেতুংয়ের ভূমিকা বিশ্লেষণ করে বলেন, মাও মার্কসবাদ-লেনিনবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তিকে চীনের বাস্তব সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সমন্বয় করেছিলেন। তাঁর মতে, বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ, অধ্যয়ন, অনুশীলন, ভুল-শুদ্ধ নিরূপণ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তার মাধ্যমে মাওয়ের রাজনৈতিক চিন্তাধারার বিকাশ ঘটে।

সমাজ পরিবর্তনে বাস্তবতার বিশ্লেষণ

সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরীর বিশ্লেষণে বলা হয়, মাও সেতুং অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। শুধু উৎপাদনশক্তি, উৎপাদন সম্পর্ক ও সম্পদের মালিকানা নয়—জনসচেতনতা ও সামাজিক চেতনাও সমাজ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে তিনি মনে করতেন।

মাওয়ের চিন্তাধারায় সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠীর অবস্থান বিশ্লেষণ করে কারা বিপ্লবের সহযোগী এবং কারা বিরোধী শক্তি—তা নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে ১৯২৬ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘চীনের সমাজের শ্রেণী বিশ্লেষণ’ বিষয়ক লেখার কথাও তুলে ধরেন সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী।

তাঁর মতে, চীনের বিপ্লবের ক্ষেত্রে মাওয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশল ছিল দেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মপন্থা নির্ধারণ করা। রাশিয়ার বিপ্লবের সঙ্গে চীনের বাস্তবতার পার্থক্য বিবেচনা করে মাও কৃষক সমাজকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সংগঠিত করেছিলেন।

গ্রামভিত্তিক সংগঠন ও দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রাম

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চীনের বিপ্লবী আন্দোলনে গ্রামীণ অঞ্চলে সংগঠন গড়ে তোলা, কৃষকদের সম্পৃক্ত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রামের মাধ্যমে শক্তি সঞ্চয়ের কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একই সঙ্গে গেরিলা যুদ্ধের সামরিক কৌশল এবং দীর্ঘ পদযাত্রা বা ‘লং মার্চ’ চীনের বিপ্লবী ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।

সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরীর মতে, মাওয়ের ‘নয়া গণতন্ত্র’-এর ধারণা বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষকে একটি রাজনৈতিক ঐক্যের কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বিশ্লেষণে জাতীয় শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে শ্রমিক, কৃষক, নারী, যুবক, ছাত্র ও মেহনতি মানুষের অংশগ্রহণের বিষয়টিও উঠে এসেছে।

অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির সম্পর্ক

মাও সেতুংয়ের বহুল আলোচিত একটি ধারণা তুলে ধরে সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী বলেন, “অর্থনীতিই ভিত্তি, রাজনীতি ও সংস্কৃতি হলো তার ঘনীভূত প্রকাশ।”

তাঁর মতে, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির মধ্যে পারস্পরিক দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক রয়েছে—মাওয়ের চিন্তাধারায় এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে ভাববাদ, সুবিধাবাদ এবং রাজনৈতিক বিচ্যুতির বিরুদ্ধে মতাদর্শিক ও সাংগঠনিক লড়াইয়ের ওপরও মাও গুরুত্ব দিয়েছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তবে মাওয়ের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে ইতিহাসে বিতর্কও রয়েছে। বিশেষ করে ‘গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ড’, সাংস্কৃতিক বিপ্লব এবং সেসব সময়ের মানবিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা রয়েছে। ফলে মাওয়ের চিন্তাধারা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্যের পাশাপাশি ঐতিহাসিক বিতর্ক ও নেতিবাচক পরিণতিগুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে মাওয়ের শিক্ষা

সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরীর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে ব্যক্তিস্বার্থ, দলীয় সংকীর্ণতা, দুর্নীতি ও সুবিধাবাদী রাজনীতির বাইরে গিয়ে জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজের বাস্তব সমস্যাগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে তার ভিত্তিতে কর্মসূচি নির্ধারণের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

তাঁর মতে, মাও সেতুংয়ের রাজনৈতিক চিন্তাধারার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোর একটি হলো—কোনো সমাজের পরিবর্তনের কর্মসূচি নির্ধারণ করতে হলে সেই সমাজের নিজস্ব বাস্তবতা, অর্থনীতি, জনগণের জীবন ও সামাজিক কাঠামোকে গভীরভাবে বুঝতে হবে।

১৯৭৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ৮২ বছর বয়সে মাও সেতুং মৃত্যুবরণ করেন। চীনের আধুনিক ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা এখনো গভীরভাবে আলোচিত ও বিতর্কিত। চীনের বিপ্লব, রাষ্ট্রগঠন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর প্রভাব বিশ্বরাজনীতিতেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে।

লেখক: সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী

লেখক ও গবেষক 

সর্বশেষ