• ২০২৬ অক্টোবর ০৬, মঙ্গলবার, ১৪৩৩ আশ্বিন ২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৫:১০ পূর্বাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

*মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয়, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নেই*।

  • প্রকাশিত ০৫:১০ পূর্বাহ্ন মঙ্গলবার, অক্টোবর ০৬, ২০২৬
*মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয়, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নেই*।
Time Bangla news
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ।

*মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয়, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নেই*। 


 *উপশিরোনাম:* ১১ বছরে ৮২৫ কোটি টাকা খরচের পরও থামেনি এডিসের বিস্তার; মৌসুমি তৎপরতা সত্বেও বাড়ছে সংক্রমণ-মৃত্যু। 

বর্ষা শেষের পথে, অথচ ডেঙ্গুর প্রকোপ কমার বদলে আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরকে সামনে রেখে কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আগেই সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু সেই সতর্কতার পরও কার্যকর প্রস্তুতির ঘাটতি কাটেনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ২ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২৫০ জন। ২০০০ সালে দেশে ডেঙ্গুর বড় প্রাদুর্ভাব শুরুর পর এক বছরে মৃত্যুর হিসাবে এটি চতুর্থ সর্বোচ্চ।

পরিস্থিতির অবনতির সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে সেপ্টেম্বর মাসে। এ মাসে ডেঙ্গুতে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন। এর আগের মাস আগস্টে মৃত্যু হয়েছিল ৪৩ জনের; হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ২০ হাজার ৫৩৬। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দুটিই আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অক্টোবরের শুরুতেও সেই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।

ডেঙ্গুর বিস্তার এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়। ঢাকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা ও বড় শহরেও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগী ভর্তি করাতে স্বজনদের এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে থাকা পরিবারগুলোর জন্য ডেঙ্গুর চিকিৎসা নতুন আর্থিক বোঝা তৈরি করছে।

 *আবহাওয়া সহায়ক, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল* 

বিশেষজ্ঞদের মতে, উষ্ণ আবহাওয়া ও থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি হয়ে উঠছে মশার প্রজননস্থল। কিন্তু এই পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও বিজ্ঞানভিত্তিক করা যায়নি।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করে তা ধ্বংস করা। এজন্য নিয়মিত কীটতাত্ত্বিক জরিপ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ এবং লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে অনেক জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে ফগিং ও লার্ভিসাইডিংয়ের মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকছে।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন গত ১১ বছরে মশা নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৮২৫ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রত্যাশিত সাফল্য না আসা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। শুধু রাজধানী নয়, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরের বাইরে মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রমও পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

 *চিকিৎসা ব্যবস্থায়ও চাপ* 

ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়লেও জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে রোগী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা সব জায়গায় সমান নয়। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা, প্রশিক্ষিত জনবল ও পর্যাপ্ত প্রস্তুতির ঘাটতি থাকায় গুরুতর রোগীদের অনেককেই শেষ পর্যন্ত ঢাকামুখী হতে হচ্ছে।

এতে রাজধানীর হাসপাতালগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—ডেঙ্গুর মতো বহুল বিস্তৃত একটি রোগের চিকিৎসার জন্য কেন প্রত্যন্ত এলাকার রোগীকেও ঢাকায় আসতে হবে? জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে রাজধানীকেন্দ্রিক চাপ কমানো সম্ভব নয়।

 *সচেতনতায় ঘাটতিও বড় কারণ* 

ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; জনগণের সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই জ্বর বা অন্যান্য প্রাথমিক উপসর্গকে সাধারণ অসুস্থতা হিসেবে নিয়ে দেরিতে চিকিৎসা নেন। ফলে রোগীর অবস্থা জটিল হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

ডেঙ্গুর প্রাথমিক লক্ষণ, কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে, বাড়িতে রোগীর কীভাবে যত্ন নিতে হবে এবং কোন সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে—এসব বিষয়ে সহজ ভাষায় নিয়মিত প্রচার প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাড়িঘর ও আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণেও জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে।

 *মৌসুমি অভিযান নয়, চাই বছরজুড়ে পরিকল্পনা* 

ডেঙ্গু এখন আর কেবল বর্ষাকালের রাজধানীকেন্দ্রিক রোগ নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সারা বছরই এর সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। ফলে বর্ষা এলেই মশা নিধন অভিযান শুরু করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পুরোনো পদ্ধতি দিয়ে এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।

প্রয়োজন বছরব্যাপী কীটতাত্ত্বিক নজরদারি, প্রজননস্থল ধ্বংস, সমন্বিত মশা নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো। একই সঙ্গে সরকারি অর্থ ব্যয়ের ফলাফলও নিয়মিত মূল্যায়ন করা জরুরি।

প্রশ্ন তাই একটাই—প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয় ও নানা কর্মসূচির পরও ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যু কেন ঠেকানো যাচ্ছে না? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজে কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা এখনই জরুরি। নইলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার খেসারত দিতে হবে আরও প্রাণ দিয়ে।

সর্বশেষ