• ২০২৬ অক্টোবর ০৬, মঙ্গলবার, ১৪৩৩ আশ্বিন ২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৫:১০ পূর্বাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

গ্যাসের মজুত কমছে, সামনে বড় জ্বালানি ঝুঁকি।*

  • প্রকাশিত ০৫:১০ পূর্বাহ্ন মঙ্গলবার, অক্টোবর ০৬, ২০২৬
গ্যাসের মজুত কমছে, সামনে বড় জ্বালানি ঝুঁকি।*
Time Bangla news
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ।

*গ্যাসের মজুত কমছে, সামনে বড় জ্বালানি ঝুঁকি।* 


 *উপশিরোনাম:* মজুত ৭.৬৩ টিসিএফ, বর্তমান হারে ১২–১৩ বছরেই শেষের শঙ্কা; কমছে দেশীয় উৎপাদন, বাড়ছে এলএনজি-নির্ভরতা। 

দেশের গ্যাসভান্ডারে নেমে এসেছে উদ্বেগজনক সংকট। বর্তমানে আবিষ্কৃত ২২টি গ্যাসক্ষেত্রে অবশিষ্ট মজুতের পরিমাণ প্রায় ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। বর্তমান হারে উত্তোলন অব্যাহত থাকলে নতুন বড় কোনো ক্ষেত্র আবিষ্কার ছাড়া আগামী ১২ থেকে ১৩ বছরের মধ্যেই এই মজুত শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এরই মধ্যে পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে।

দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ২৬০ থেকে ২৬৫ কোটি ঘনফুটের মতো। ঘাটতি পূরণে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের ব্যবধান পুরোপুরি কাটছে না। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তায় বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা।

গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়ছে শিল্প ও বিনিয়োগেও। জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নতুন গ্যাস সংযোগের জন্য ১ হাজার ৮৫৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আবেদন দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৫০টি প্রতিষ্ঠান চার থেকে পাঁচ বছর আগে ডিমান্ড নোটের অর্থ পরিশোধ করেও সংযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। বিনিয়োগ সংশ্লিষ্টরাও গ্যাসের অপ্রতুলতাকে নতুন বিনিয়োগের অন্যতম বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

 *কমছে পুরোনো ক্ষেত্রের উৎপাদন* 

দেশে এখন পর্যন্ত ২২টি গ্যাসক্ষেত্রে মোট ২৯ দশমিক ৭৪ টিসিএফ গ্যাস আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২২ দশমিক ১১ টিসিএফ ইতোমধ্যে উত্তোলন করা হয়েছে। অবশিষ্ট রয়েছে ৭ দশমিক ৬৩ টিসিএফ। এসব ক্ষেত্র থেকে বছরে প্রায় শূন্য দশমিক ৭ টিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রই এখন উৎপাদন কমে যাওয়ার পর্যায়ে রয়েছে।

দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি গ্যাসক্ষেত্র তিতাসে একসময় দৈনিক ৫৪ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস উৎপাদিত হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৩৩ কোটি ৩৫ লাখ ঘনফুটে। বাখরাবাদে উৎপাদন ৪ কোটি ৩০ লাখ থেকে কমে হয়েছে ১ কোটি ৮৬ লাখ ঘনফুট। সিলেট গ্যাসক্ষেত্রেও দৈনিক উৎপাদন ১ কোটি ৩০ লাখ থেকে কমে প্রায় ৬০ লাখ ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে।

বেসরকারি খাতের বড় ক্ষেত্র বিবিয়ানাতেও একই চিত্র। মার্কিন কোম্পানি শেভরনের পরিচালনাধীন এই ক্ষেত্র থেকে একসময় দৈনিক প্রায় ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলেও বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৭৫ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট। মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় রূপগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন বন্ধ হয়েছে। সুন্দলপুর ক্ষেত্র থেকেও এখন দৈনিক মাত্র ১১ লাখ ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।

 *কূপ খননে বড় ব্যয়, মিলছে কম গ্যাস* 

দেশীয় গ্যাসের মজুত বাড়াতে ১০০ কূপ খননের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তা বাড়িয়ে ১৫০ কূপে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এরই মধ্যে ৩০টি কূপ খননে ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা। তবে এসব কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে মাত্র ১২ কোটি ৫৩ লাখ ঘনফুট গ্যাস।

পেট্রোবাংলার হিসাবে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২৯ সালে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর দৈনিক উৎপাদন ১৬০ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট থেকে কমে প্রায় ১৪০ কোটি ঘনফুটে নেমে যেতে পারে। এমনকি ২০২৭-২৮ সালেই মোট গ্যাস সরবরাহ দৈনিক ২৫৭ কোটি ঘনফুটে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 *ভোলার গ্যাসও কাজে লাগানো যাচ্ছে না* 

২০১৮ সালে ভোলায় মাঝারি আকারের একটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের পর দেশে আর নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়নি। বাপেক্সের ধারণা, ভোলায় ২ থেকে ৩ টিসিএফ গ্যাস মজুত থাকতে পারে। কিন্তু মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে গ্যাস পরিবহনের পাইপলাইন না থাকায় ওই গ্যাসের বড় অংশ জাতীয় ব্যবস্থায় যুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।

এদিকে ভূখণ্ডে বড় ধরনের নতুন মজুত পাওয়ার সম্ভাবনা কমে আসায় সমুদ্রাঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে অনুসন্ধানের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা সফল করার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ইজাজ হোসেনের মতে, গ্যাস সংকট মোকাবিলায় এখন আর অপেক্ষা করার সুযোগ নেই। স্থলভাগে বড় মজুত পাওয়ার সম্ভাবনা সীমিত হওয়ায় সমুদ্রের অনুসন্ধান কার্যক্রম দ্রুত সফল করা জরুরি। তা না হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

 *শিল্পে বাড়ছে অনিশ্চয়তা* 

গ্যাসের চাপ সরাসরি পড়ছে শিল্প উৎপাদনে। নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেছেন, সরবরাহ না বাড়লে এবং নতুন শিল্পে সংযোগ দেওয়া সম্ভব না হলে দেশে নতুন কারখানা স্থাপনের পরিবেশ নষ্ট হবে। একই সঙ্গে গ্যাসের সংকটে বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে।

শিল্পে গ্যাসের ঘাটতি দীর্ঘায়িত হলে শুধু উৎপাদন কমবে না, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 *সমাধানে ১৫০ কূপ ও তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল* 

পেট্রোবাংলার পরিকল্পনা অনুযায়ী, দ্রুত কূপ খনন বাড়ানোর পাশাপাশি তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করা হলে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো সম্ভব। ১৫০ কূপ খনন ও তৃতীয় এফএসআরইউ চালু করা গেলে ২০২৯ সালের শেষ নাগাদ অথবা ২০৩০ সালে দৈনিক ৩১৩ থেকে ৩৪৪ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে।

মাতারবাড়ীতে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগও এগোচ্ছে। চীন সরকারের সঙ্গে সরকারি পর্যায়ের চুক্তির আওতায় চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (সিএনইই) কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

অন্যদিকে মার্কিন কোম্পানি শেভরন সিলেট অঞ্চলের ১১ ও ১২ নম্বর ব্লকে কাজের সুযোগ পেলে সম্ভাবনাময় গ্যাস কাঠামোগুলোতে নতুন কূপ খননের প্রস্তাব দিয়েছে। কোম্পানিটির হিসাবে, সেখানে কয়েক বছরে আরও প্রায় ৫ টিসিএফ গ্যাস আবিষ্কারের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে ২০৩৫ সাল নাগাদ এলএনজি আমদানির ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতে পারে।

তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে দেরি হলে দেশীয় উৎপাদন কমার সঙ্গে সঙ্গে আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়বে। ফলে গ্যাসের বর্তমান সংকট ভবিষ্যতে শিল্প, বিদ্যুৎ ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের জ্বালানি ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।

সর্বশেষ