*নালার কাজেও চাঁদাবাজি, বাড়িপ্রতি দাবি ২০–৫০ হাজার টাকা।*
*উপশিরোনাম:* আদাবরে নয়ন ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে জোর করে কাজ করানো ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ; তদন্ত করছে ডিবি।
রাজধানীর আদাবরে সড়কের সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত নালা ও পয়োনিষ্কাশন লাইনের কাজ নিজেদের লোক দিয়ে করাতে ভবনমালিকদের বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ছাত্রদল নেতা নয়ন হোসেন ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, কাজের নামে বাড়িপ্রতি ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে। এ ছাড়া চাঁদাবাজি, দোকান ও কারখানা থেকে অর্থ আদায় এবং ভবন দখলের চেষ্টার মতো অভিযোগও সামনে এসেছে।
কারওয়ান বাজারের মাছের আড়ত থেকে চাঁদা তোলার অভিযোগে আদাবর থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক নয়ন হোসেনকে গ্রেপ্তারের পর এসব অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন; সেগুলোর সত্যতা আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) নয়নকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানায়। এরপর আদাবরের মনসুরাবাদ হাউজিং এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের তথ্য পাওয়া যায়।
*নালার কাজ ঘিরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ*
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মনসুরাবাদ হাউজিংয়ের ৬ নম্বর সড়কে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় সড়ক সংস্কারের কাজ চলার সময় আশপাশের ৫০ থেকে ৬০টি ভবনের পানি ও পয়োনিষ্কাশন লাইনের কাজ নির্দিষ্ট লোকজনকে দিয়ে করানোর চাপ দেওয়া হয়। নিজেদের পছন্দের মিস্ত্রি দিয়ে কাজ করাতে চাইলে বাধার মুখে পড়তে হয় ভবনমালিকদের। পরে কাজের জন্য নির্ধারিত অর্থের বাইরে অতিরিক্ত টাকা দাবি ও আদায়ের অভিযোগ ওঠে।
সড়কটির ৬৯ ও ৭০ নম্বর বাড়ির নালার কাজের জন্য ৫৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। তাঁদের দাবি, পরিচিত মিস্ত্রি দিয়ে কাজ করানোর উদ্যোগ নিলে চার-পাঁচজন ব্যক্তি নিজেদের ছাত্রদল নেতা নয়নের লোক পরিচয় দিয়ে চাপ সৃষ্টি করেন। অতিরিক্ত টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় বাড়ির মালিককে হুমকিও দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয় বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
একই সড়কের আরেকটি ভবনের নিরাপত্তাকর্মীর অভিযোগ, অন্য মিস্ত্রি দিয়ে যে কাজ ১০ হাজার টাকায় করানো সম্ভব ছিল, সেই কাজের জন্য তিন দফায় জোর করে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা আদায় করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ঘটনা কেবল একটি বা দুটি ভবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সড়ক সংস্কারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ভবনের নালা ও পয়োনিষ্কাশন লাইনের কাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে অভিযোগের ব্যাপ্তি, অর্থ আদায়ের প্রকৃত পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
*কারখানা, ফুটপাত ও নির্মাণাধীন ভবনেও চাঁদার অভিযোগ*
নয়ন হোসেনের পাশাপাশি আদাবর থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মনিরুজ্জামান মজুমদার জসিমের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন স্থানে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, এমব্রয়ডারি কারখানা, ফুটপাতের দোকান এবং নির্মাণাধীন ভবন থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হতো।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আদাবর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুম বাবুলের একটি বাড়ি দখলের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে নয়ন ও জসিমের অনুসারীদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, বাড়িটি দখলে ব্যর্থ হয়ে সেখানে ভাঙচুর চালানো হয়। এ ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে হামলার সময় স্থানীয় ছাত্রদলের একাধিক নেতাকে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের তথ্য পাওয়া না গেলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
*অভিযোগ অস্বীকার জসিমের, পাল্টা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের দাবি*
চাঁদাবাজি ও বাড়ি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ছাত্রদলের সদস্যসচিব মনিরুজ্জামান জসিম। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট ঘটনায় তিনি বিরোধ মীমাংসার উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়েছিলেন। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাঁকে জড়িয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে, গত মাসে মিরপুরের একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলার ঘটনার পর ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের আওতাধীন আদাবর থানা কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক আকরাম আহমেদ দাবি করেছেন, আদাবরের ঘটনার কথা বলে নয়নকে আটক করা হলেও পরে তাঁকে কারওয়ান বাজারের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তাঁর মতে, এর পেছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে।
তবে আকরামের এ দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
*অন্যান্য অভিযোগও খতিয়ে দেখছে ডিবি*
নয়ন হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও সন্দেহের ভিত্তিতেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি জানান, আদাবরে নয়নের বিরুদ্ধে ওঠা অন্যান্য চাঁদাবাজির অভিযোগও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্তে অন্য কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে অর্থ লেনদেনের তথ্য, সংশ্লিষ্ট কাজের দরপত্র ও ব্যয়ের হিসাব, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং সিসিটিভি ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তদন্ত শেষে অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্যসূত্র: ইত্তেফাক।
মতামত দিন