*বছরে সাড়ে সাত হাজার মৃত্যু, তবু অর্থের অভাবে থমকে প্রতিষেধক গবেষণা।*
*উপশিরোনাম:* ভারতনির্ভর অ্যান্টিভেনম, নিজস্ব প্রতিষেধক গবেষণায় অর্থের টান। গবেষণার সাফল্য মিলেছে, অর্থের অভাবে আটকে অ্যান্টিভেনম উৎপাদন।
দেশে প্রতিবছর সাপের কামড়ে প্রাণ হারান গড়ে প্রায় সাড়ে সাত হাজার মানুষ। অথচ সাপের বিষের প্রতিষেধক তৈরির লক্ষ্যে গড়ে ওঠা দেশের একমাত্র ভেনম রিসার্চ সেন্টার এখন অর্থসংকটে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে। সরকারি বরাদ্দ বন্ধ থাকায় বন্ধ হয়ে গেছে গবেষণার অধিকাংশ কার্যক্রম। অনিশ্চয়তায় পড়েছে প্রতিষেধক তৈরির উদ্যোগ; ঝুঁকিতে রয়েছে গবেষণাকেন্দ্রে সংরক্ষিত ১১ প্রজাতির ৩৭০টি সাপ এবং প্রায় ১ হাজার ৭০০ গ্রাম সংগৃহীত বিষ।
২০১৮ সালের মার্চে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে যাত্রা শুরু করে ভেনম রিসার্চ সেন্টার। বাংলাদেশে সাপের বিষের আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে নিজস্ব অ্যান্টিভেনম তৈরির লক্ষ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়।
কিন্তু পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পের অর্থায়ন শেষ হওয়ার পর ২০২৪ সালের জুন থেকে আর কোনো সরকারি বরাদ্দ পায়নি কেন্দ্রটি। এরপর থেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগ, ধারদেনা ও সামান্য অনুদানের মাধ্যমে কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা। তাঁদের আশঙ্কা, এভাবে আর বেশিদিন প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।
গবেষণাকেন্দ্রটির জন্য নতুন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করে সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। প্রায় এক বছর ধরে প্রস্তাবটি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ঘুরে বর্তমানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আটকে রয়েছে। দ্রুত অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দ না মিললে গবেষণার পাশাপাশি সাপগুলোর পরিচর্যাও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
*গবেষণার খরচ জোগাতে হিমশিম*
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় প্রায় আট কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পে কেন্দ্রটির কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। শুরুতে পাঁচটি সাপ নিয়ে গবেষণা শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সাপ সংগ্রহ ও প্রজননের মাধ্যমে বর্তমানে সেখানে ১১ প্রজাতির ৩৭০টি সাপ রয়েছে।
এসব সাপের খাবারের জন্য প্রতি মাসে প্রায় তিন হাজার ইঁদুর প্রয়োজন হয়। শুধু ইঁদুরের খাবার বাবদ ব্যয় প্রায় এক লাখ টাকা। কর্মচারীদের বেতনসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে মাসে প্রয়োজন সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা।
কেন্দ্রটির সমন্বয়ক ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সাঈদ বলেন, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর অর্থ বরাদ্দ চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছে। ডিপিপি প্রস্তুত করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেও জমা দেওয়া হয়। পরে পরিকল্পনা ও অর্থ মন্ত্রণালয় ঘুরে সেটি এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে রয়েছে।
তিনি জানান, বরাদ্দ বন্ধ হওয়ার পর ব্যক্তিগত উদ্যোগে কোটি টাকার বেশি ব্যয় করে কেন্দ্রটি চালু রাখা হয়েছে। সামান্য অনুদানের পাশাপাশি ধারদেনা করেও খরচ মেটাতে হয়েছে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন কার্যক্রম চালানো সম্ভব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
*রাসেলস ভাইপারের প্রতিষেধক তৈরিতে অগ্রগতি*
অর্থসংকটের মধ্যেও প্রায় সাড়ে আট বছরের গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বিশেষ করে দেশে আলোচিত রাসেলস ভাইপারের বিষের প্রতিষেধক তৈরির প্রাথমিক ধাপগুলোতে সফলতা পেয়েছেন গবেষকেরা।
গবেষণাকেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, রাসেলস ভাইপারের বিষ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করার পর তা মুরগি ও ইঁদুরের শরীরে প্রয়োগ করা হয়েছে। এতে অ্যান্টিবডি তৈরির সাফল্যও পাওয়া গেছে। পরবর্তী পর্যায়ে মনোভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম তৈরির গবেষণা এগিয়ে নিতে পরীক্ষার প্রতিবেদন ও পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
তবে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও অর্থায়ন না থাকায় পরবর্তী ধাপের গবেষণা শুরু করা যাচ্ছে না।
আবদুল্লাহ আবু সাঈদ বলেন, অ্যান্টিবডি কার্যকর প্রমাণিত হলে পরবর্তী সময়ে অ্যান্টিভেনম তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। এটি মূলত ওষুধ উৎপাদনসংক্রান্ত প্রক্রিয়া, যার জন্য সরকারি উদ্যোগ এবং ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা প্রয়োজন।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে কেন্দ্রটির গবেষকেরা দেশীয় সাপ ও বিষ নিয়ে আন্তর্জাতিক জার্নালে ১১টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। এসব গবেষণায় সাপের নতুন প্রজাতি শনাক্ত, ভৌগোলিক বিস্তৃতি, জিনগত বৈচিত্র্য, বিষের গঠন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং সাপের কামড়ের চিকিৎসাসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে।
*খাবার কমিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে সাপ*
অর্থের অভাবে বর্তমানে গবেষণাকেন্দ্রের ল্যাব পরীক্ষা, তথ্য বিশ্লেষণ ও পরবর্তী পর্যায়ের গবেষণা কার্যক্রম প্রায় পুরোপুরি বন্ধ। শুধু সাপ ও প্রয়োজনীয় ইঁদুরগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে।
সহকারী গবেষক আবদুল আওয়াল জানান, আগে সাপগুলোকে প্রতি সপ্তাহে খাবার দেওয়া হলেও এখন দুই থেকে তিন সপ্তাহ পরপর খাবার দেওয়া হচ্ছে। খাবারের পরিমাণও কমিয়ে আনা হয়েছে।
গবেষণাকেন্দ্রের সমন্বয়ক আবদুল্লাহ আবু সাঈদ বলেন, বন্দি অবস্থায় দীর্ঘদিন থাকার কারণে সাপগুলোকে এখন প্রকৃতিতে ছেড়ে দিলেও স্বাভাবিকভাবে খাবার সংগ্রহ করে বেঁচে থাকা কঠিন হবে। আবার এতগুলো বিষধর সাপ মেরে ফেলারও সুযোগ নেই।
তিনি জানান, গবেষণার প্রয়োজনে বিভিন্ন প্রজাতির সাপ থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৭০০ গ্রাম বিষ সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এসব বিষ অত্যন্ত মূল্যবান ও দুষ্প্রাপ্য। এগুলোর যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
*আমদানি নির্ভর অ্যান্টিভেনম*
বাংলাদেশে বর্তমানে সাপের কামড়ের চিকিৎসায় মূলত ভারত থেকে আমদানি করা পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম ব্যবহার করা হয়। এটি গোখরা, কেউটে ও রাসেলস ভাইপারের বিষের বিরুদ্ধে কার্যকর। তবে দেশে থাকা অন্যান্য বিষধর সাপ, বিশেষ করে বিভিন্ন প্রজাতির সবুজ পিট ভাইপার ও সামুদ্রিক সাপের কামড়ের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় প্রতিষেধকের ঘাটতি রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৫৪ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন। এর মধ্যে ১৮ থেকে ২৭ লাখ মানুষ বিষধর সাপের দংশনের শিকার হন। সাপের কামড়ে প্রতিবছর বিশ্বে ৪১ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
*বাংলাদেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক গবেষণায় প্রতিবছর প্রায় ৮ লাখ ৯০ হাজার মানুষের সাপের দংশনের শিকার হওয়ার এবং প্রায় সাড়ে সাত হাজার মানুষের মৃত্যুর তথ্য উঠে এসেছে।*
এদিকে গত বছর মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে অ্যান্টিভেনম উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের উদ্যোগের কথাও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
ভেনম রিসার্চ সেন্টারের মুখ্য গবেষক অধ্যাপক অনিরুদ্ধ ঘোষ জয় বলেন, নতুন প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে সরকারি উদ্যোগে গবেষণাকেন্দ্রের কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। তবে এ ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
*সংশ্লিষ্ট গবেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের গবেষণায় গড়ে ওঠা অবকাঠামো, সাপের সংগ্রহ এবং সংরক্ষিত বিষ রক্ষা করা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়, এটি দেশের জনস্বাস্থ্য ও গবেষণার স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত। তাই প্রকল্প অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দে আর বিলম্ব না করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।*
মতামত দিন