গাবতলী-দাশেরকান্দি মেট্রোরেলে বদলাবে ঢাকার পশ্চিম-পূর্ব যোগাযোগ
রাজধানীর পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে এগোচ্ছে এমআরটি লাইন-৫-এর দক্ষিণ রুট। গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মেট্রোরেল প্রকল্পের ডিপিপি একনেকে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, রুটটির বড় অংশ হবে পাতালপথে, আর আফতাবনগর থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত অংশ নির্মিত হবে উড়ালপথে।
প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা। বাকি ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের উন্নয়ন সহায়তা তহবিল (ইডিসিএফ) থেকে পাওয়ার কথা রয়েছে।
হাতিরঝিলের নিচ দিয়ে যাবে মেট্রোরেল
প্রস্তাবিত রুটটি গাবতলী থেকে শুরু হয়ে টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার হয়ে হাতিরঝিলের নিচ দিয়ে তেজগাঁও ও আফতাবনগরের দিকে যাবে। গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত প্রায় ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার অংশ থাকবে ভূগর্ভে। এরপর আফতাবনগর থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ৪ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে উড়ালপথ।
পুরো রুটে ১৫টি স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি পাতাল এবং চারটি উড়াল স্টেশন। পাতাল অংশের টানেল মাটির উপরিভাগ থেকে প্রায় ১৬ থেকে ৩৮ মিটার গভীরে নির্মাণ করা হবে।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) মনে করছে, রাজধানীর পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মধ্যে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ স্থাপনে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
একনেকে উঠছে প্রকল্প
প্রকল্পটি একনেক সভায় উপস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে পরিকল্পনা কমিশন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এরই মধ্যে প্রকল্পের ডিপিপিতে স্বাক্ষর করেছেন।
আগামী ১৯ আগস্ট একনেক সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন করা সম্ভব না হলে পরবর্তী সভায় তা তোলা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এমআরটি লাইন-৫ দক্ষিণ রুটের প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব বলেন, প্রকল্পটি একনেক সভায় উপস্থাপনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সভায় না উঠলেও পরবর্তী একনেক সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হবে।
যাত্রী পরিবহনে বড় সক্ষমতা
পরিকল্পনা অনুযায়ী, শুরুতে ছয় কোচের ১৯ সেট মেট্রোরেল দিয়ে সেবা চালু করা হবে। পরবর্তীতে ২০৪০ সাল থেকে ছয় কোচের পরিবর্তে আট কোচের ট্রেন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিটি ছয় কোচের ট্রেনে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩১২ জন যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা থাকবে। শুরুতে একদিকে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২০ হাজার ১০৭ জন যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে। ভবিষ্যতে ২০৬০ সালে এই সক্ষমতা বেড়ে ঘণ্টায় ৩৮ হাজার ২৫৫ জনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিটি ট্রেনে নারীদের জন্য পৃথক একটি কোচ রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী প্রায় ৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ড পরপর মেট্রোরেল পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
উড়াল অংশে ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার এবং পাতাল অংশে সর্বোচ্চ গতি ৯০ কিলোমিটার রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
২০৩০-৩১ অর্থবছরে চালুর লক্ষ্য
এডিবির সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে এই রুটে যাত্রী পরিবহন শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রকল্পটি চালু হলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কর্মঘণ্টা সাশ্রয়ের পাশাপাশি জ্বালানি ব্যবহার ও সড়কে যানবাহনের চাপ কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সমীক্ষা অনুযায়ী, বছরে প্রায় ২১ কোটি ৪৯ লাখ ৭০ হাজার কর্মঘণ্টা সাশ্রয় হতে পারে। একই সঙ্গে প্রায় ৪১ দশমিক ২২ হাজার টন জ্বালানি সাশ্রয় এবং যানবাহনের চলাচলের দূরত্ব প্রায় ৬ লাখ ৪২ হাজার কিলোমিটার কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
গণপরিবহনে যাত্রী স্থানান্তরের ফলে সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ কমলে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ ৭ হাজার ৯৬৪ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে বলে সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্মাণে ব্যবহার হবে উত্তোলিত মাটি
পাতাল স্টেশন নির্মাণে ‘কাট অ্যান্ড কভার’ পদ্ধতি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে সড়কের একটি অংশ খনন করে স্টেশন নির্মাণের কাজ করা হবে। পরে নির্মাণাধীন অংশ স্টিলের পুরু পাত দিয়ে ঢেকে দেওয়া হবে, যাতে তার ওপর দিয়ে যানবাহন চলাচল করতে পারে এবং নিচে নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখা যায়।
নির্মাণকাজ চলাকালে সংশ্লিষ্ট সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বিকল্প ও সমান্তরাল সড়কে ট্রাফিক ডাইভারশনের ব্যবস্থা করা হবে।
ডিএমটিসিএলের হিসাবে, ১১টি পাতাল স্টেশন ও টানেল নির্মাণে প্রায় ৩১ লাখ ২০ হাজার ঘনমিটার মাটি উত্তোলন হতে পারে। বিপুল পরিমাণ এই মাটি দাশেরকান্দি ও আশপাশের নিচু এলাকার ভূমি উন্নয়ন, ডিপোর সংযোগ সড়ক এবং বিভিন্ন সরকারি অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য মেট্রোরেল প্রকল্পের ডিপো এলাকার ভূমি উন্নয়নেও এ মাটি ব্যবহার করা হতে পারে। অতিরিক্ত মাটি থাকলে তা উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রির পরিকল্পনাও রয়েছে।
শব্দদূষণ কমাতেও থাকবে ব্যবস্থা
মেট্রোরেল প্রকল্পে শব্দ ও কম্পন নিয়ন্ত্রণে বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা জানিয়েছে ডিএমটিসিএল। ট্রেনের ব্রেকিং ব্যবস্থায় ইলেক্ট্রো-নিউমেটিক সার্ভিস সিস্টেম থাকায় ব্রেক করার সময় ঝাঁকুনি কম হবে।
উড়াল অংশের ভায়াডাক্টের দুই পাশে শব্দ প্রতিরোধক দেয়াল নির্মাণ করা হবে। অন্যদিকে পাতাল অংশে টানেলের চারপাশের মাটিই শব্দ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আব্দুল ওহাবের ভাষ্য, আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থার কারণে প্রকল্পটি নগরবাসীর চলাচল সহজ করার পাশাপাশি পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কমাতে সহায়ক হবে।
পাতাল ও উড়াল স্টেশনগুলোতে লিফট, এস্কেলেটর ও সিঁড়ির ব্যবস্থা থাকবে। এসব সুবিধা ব্যবহার করে সাধারণ পথচারীরাও রাস্তার এক পাশ থেকে অন্য পাশে যাতায়াত করতে পারবেন। তবে স্টেশনের পেইড জোন ও প্ল্যাটফর্ম এলাকায় প্রবেশের সুযোগ থাকবে না।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে এমআরটি লাইন-৫ দক্ষিণ রুট চালুর পর রাজধানীর পশ্চিমাঞ্চল থেকে পূর্বাঞ্চলে যাতায়াতের ক্ষেত্রে নতুন গতি তৈরি হবে। একই সঙ্গে সড়কনির্ভর পরিবহনের ওপর চাপ কমিয়ে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও সমন্বিত করার পথও তৈরি হবে।
মতামত দিন