নির্মাণশ্রমিকের স্বপ্নে রাশিয়া, ঠাঁই হলো যুদ্ধক্ষেত্রে; ড্রোন হামলায় পঙ্গু রাজন
সংসারের অভাব দূর করতে বিদেশে গিয়ে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করার স্বপ্ন দেখেছিলেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার তরুণ রাজন হোসেন। সেই স্বপ্ন নিয়ে দালালের মাধ্যমে ৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা খরচ করে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন ২২ বছর বয়সী এই যুবক। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পরই বদলে যায় সবকিছু। নির্মাণশ্রমিকের পরিবর্তে তাকে পাঠানো হয় যুদ্ধের প্রশিক্ষণে। শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রুশ বাহিনীর হয়ে যুদ্ধের ময়দানে যেতে বাধ্য হন তিনি।
যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার প্রথম দিনেই ঘটে ভয়াবহ ঘটনা। রাজনের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় সেদিন ১৭ বাংলাদেশি নিহত হন। একই হামলায় গুরুতর আহত হন রাজনও। ড্রোনের আঘাতে তার কোমরের হাড় ভেঙে যায়। এরপর থেকে দুই পায়ের শক্তি হারিয়েছেন তিনি।
দীর্ঘ চিকিৎসার পর গত ২১ আগস্ট ট্রাভেল পাস নিয়ে দেশে ফিরেছেন রাজন। বর্তমানে নিজে দাঁড়ানো বা হাঁটার সক্ষমতা হারিয়ে পরিবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন তিনি। চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ পুনর্বাসন নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছে পরিবার।
রাজন হোসেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মালিয়াট ইউনিয়নের গয়েশপুর গ্রামের আব্দুল কাদের কালুর ছেলে।
কাজের কথা বলে নিয়ে যাওয়া, পরে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ
রাজন ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করার উদ্দেশ্যে চলতি বছরের ৭ মে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ার উদ্দেশে রওনা হন রাজন। একই দিন মস্কো বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি।
মস্কো থেকে রাজনসহ প্রায় ৩০ বাংলাদেশিকে একটি বাসে করে নিয়ে যাওয়া হয় ওরেনবার্গে। সেখানে একটি হোটেলে তিন থেকে চার দিন রাখা হয় তাদের। এ সময় ব্যাংক কার্ড ও সিম কার্ড দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন কাগজপত্রে তাদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
এরপর কাজের ব্যবস্থা করার কথা বলে রাজনসহ অন্য বাংলাদেশিদের নিয়ে যাওয়া হয় একটি রুশ সেনাক্যাম্পে। সেখানেই তারা বুঝতে পারেন, নির্মাণকাজ নয়, তাদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
রাজনের ভাষ্য, তারা যুদ্ধে যেতে রাজি ছিলেন না। বিষয়টি জানিয়ে রাশিয়ান চক্রের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে আকুতি জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি। এমনকি তাদের পা ধরে অনুরোধ করার পরও ছাড় দেওয়া হয়নি।
পরে তাদের রুশ সেনাবাহিনীর গাড়িতে তুলে একটি বাংকারে নিয়ে রাখা হয়।
২১ দিনের প্রশিক্ষণ, এরপর সরাসরি ফ্রন্টলাইনে
রাজন জানান, সেনাক্যাম্পে নেওয়ার পর প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে ৩০ বাংলাদেশিকে কয়েকটি দলে ভাগ করা হয়। তিনি ছিলেন ছয় সদস্যের একটি দলে।
এরপর তাদের রুশ সেনাবাহিনীর পোশাক দেওয়া হয়। পাশাপাশি অস্ত্র চালানো এবং যুদ্ধের বিভিন্ন কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রায় ২১ দিন প্রশিক্ষণ শেষে তাদের পাঠানো হয় যুদ্ধের সম্মুখসারিতে।
রাজনের বর্ণনায়, ফ্রন্টলাইনে যাওয়ার প্রথম দিনই ড্রোন হামলার মুখে পড়েন তারা।
সেদিনের ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে রাজন জানান, হামলায় ১৭ বাংলাদেশি নিহত হন। একটি ড্রোনের আঘাতে তিনি কোমরে গুরুতর আঘাত পান। মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর কোমরের নিচের অংশে আর কোনো শক্তি অনুভব করছিলেন না।
চার দিনে চার কিলোমিটার পথ পাড়ি
গুরুতর আহত অবস্থায়ও বাঁচার জন্য লড়াই চালিয়ে যান রাজন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় চার দিন ধরে বুকের ওপর ভর করে হামাগুড়ি দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন ইউক্রেনের একটি হাসপাতালে পৌঁছান তিনি।
সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাকে রাশিয়ার একটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। প্রায় ১৫ দিন সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরে এক চিকিৎসকের সহযোগিতায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ হয় এবং দেশে ফেরার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
অবশেষে গত ২১ আগস্ট ট্রাভেল পাস নিয়ে দেশে ফেরেন রাজন।
তিনি জানান, দেশে ফেরার জন্য তার পরিবার রাশিয়ায় ৬২ হাজার রুবল পাঠিয়েছিল। বাংলাদেশ থেকে জাবাল-ই-নূর রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে তাদের রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
‘ধারদেনা করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম’
রাজনের বাবা আব্দুল কাদের জানান, ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর জন্য ধারদেনা করে ৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা খরচ করেছিলেন তারা। একতারপুর গ্রামের লেন্টু হোসেনের মাধ্যমে রাশিয়ায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
তার দাবি, প্রায় তিন বছর ধরে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করার পর চলতি বছরের মে মাসে নির্মাণশ্রমিকের কাজের কথা বলে রাজনকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে গিয়ে ছেলেকে যুদ্ধের ময়দানে পাঠানো হয়।
আব্দুল কাদের বলেন, যুদ্ধের ঘটনায় তার ছেলে এখন হাঁটতে পারছেন না। তার নিজেরও ছেলের চিকিৎসা চালানোর মতো সামর্থ্য নেই। প্রতারণার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
রাজনের মা মাহফুজ বেগম বলেন, সংসারের অভাব কিছুটা কমানোর আশায় বড় ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন তারা। কিন্তু সুস্থ-সবল ছেলে এখন দুই পায়ের শক্তি হারিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে অন্যের সহায়তায় সংসার চালাতে হচ্ছে তাদের।
‘পরিবারটি সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে’
রাজনের প্রতিবেশী ও কলেজ শিক্ষক মুসা করিম বলেন, দালালের মাধ্যমে বিদেশে যাওয়ার পর পরিবারটি সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হয়ে রাজনের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত করুণ। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
প্রতারণার অভিযোগ অস্বীকার স্থানীয় এজেন্টের
রাজনকে রাশিয়ায় পাঠানোর স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে অভিযুক্ত আবু তাহের লেন্টু প্রতারণার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তার দাবি, রাজনকে তার ভাগনে সোহেলের মাধ্যমে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। তিনি কোনো ধরনের প্রতারণার সঙ্গে জড়িত নন এবং এজেন্সির মাধ্যমেই রাজনকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
সহায়তার আশ্বাস উপজেলা প্রশাসনের
দেশে ফেরার পর রাজনকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা নাহিদ।
তিনি বলেন, বিদেশে যাওয়ার সময় দালালের খপ্পরে পড়ে যাতে কেউ প্রতারণার শিকার না হন, সে বিষয়ে মানুষকে আরও সচেতন হতে হবে। রাশিয়া থেকে ফিরে আসা রাজনের পাশে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
নির্মাণশ্রমিক হয়ে পরিবারের হাল ধরার স্বপ্ন নিয়ে রাশিয়ায় যাওয়া রাজন এখন নিজেই পরিবারের বোঝা হয়ে পড়েছেন। যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, দুই পায়ের শক্তি হারানো এবং চিকিৎসার ব্যয়—সব মিলিয়ে অনিশ্চিত তার সামনে থাকা দিনগুলো। পরিবারের একমাত্র প্রত্যাশা, রাজনের উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হবে এবং তাকে প্রতারণার মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মতামত দিন