বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে বড় চ্যালেঞ্জ, জ্বালানি সংকট কাটাতে সরকারের নতুন উদ্যোগ
গ্যাস সংকটে কমছে উৎপাদন, বাড়ছে লোডশেডিং; ১৫ দিনের মধ্যে পরিস্থিতি উন্নতির আশা সরকারের
নিজস্ব প্রতিবেদক: মোঃ সাখাওয়াৎ হোসেন
দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহের অভাবে সেই সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বিশেষ করে গ্যাসের ঘাটতি বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে সাধারণ গ্রাহকের বিদ্যুৎ সরবরাহেও।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৯৩৫ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ হয়েছে ১৪ হাজার ৩৫৬ মেগাওয়াট। ফলে ওই সময়ে লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৫৭৯ মেগাওয়াট। সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটেও চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৮১০ মেগাওয়াট, সরবরাহ ১৪ হাজার ৬৫৬ মেগাওয়াট এবং ঘাটতি ২ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট।
শুধু সন্ধ্যার পিক আওয়ারেই নয়, দিনের বিভিন্ন সময়েও চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। ৭ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টায় চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৪৬৩ মেগাওয়াট, অথচ সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ২৪৭ মেগাওয়াট—ঘাটতি ছিল ২ হাজার ২১৬ মেগাওয়াট।
সংকটের কেন্দ্রে গ্যাস
বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) হলেও সরবরাহ রয়েছে আনুমানিক ২ হাজার ৬০০–২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন খাতে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে।
গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য বিপুল পরিমাণ ফার্নেস অয়েল চেয়েছে, যাতে গ্যাসনির্ভর উৎপাদন কমে গেলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ যতটা সম্ভব সচল রাখা যায়।
১৫ দিনের মধ্যে উন্নতির আশা
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও আশার কথা জানানো হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রতিমন্ত্রী অমিত গত ২ সেপ্টেম্বর সংসদে জানিয়েছিলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি আগামী ১৫ দিনের মধ্যে উন্নতির আশা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে সরকার দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার করছে। নতুন কূপ খনন, পুরোনো কূপে ওয়ার্কওভার এবং ভূকম্পন জরিপসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে সৌরবিদ্যুতের দিকে নজর
জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সক্ষমতা আছে, প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি
বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংকটটি কেবল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বা উৎপাদনক্ষমতার ঘাটতি নয়। বরং পর্যাপ্ত গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েল সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করা কঠিন হচ্ছে।
ফলে সরকারের সামনে এখন দুটি তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ—জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে বর্তমান চাহিদা পূরণ করা এবং দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে একটি স্থিতিশীল জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
সরকারের ১৫ দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতির প্রত্যাশা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন সাধারণ মানুষ ও শিল্পখাতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ শুধু নাগরিক জীবনের স্বাভাবিকতার জন্য নয়, শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও সরাসরি জড়িত। বর্তমান সংকটের কারণে বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে।
মতামত দিন