• ২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৫, মঙ্গলবার, ১৪৩৩ ভাদ্র ৩০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৯:০৯ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

পোশাকের পর চিপ—বাংলাদেশের পরবর্তী রপ্তানি যুদ্ধ”*

  • প্রকাশিত ১২:০৯ পূর্বাহ্ন মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬
পোশাকের পর চিপ—বাংলাদেশের পরবর্তী রপ্তানি যুদ্ধ”*
Time Bangla news
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ

*“পোশাকের পর চিপ—বাংলাদেশের পরবর্তী রপ্তানি যুদ্ধ”* 


বিশ্ব অর্থনীতির নতুন শক্তির কেন্দ্র এখন আর শুধু তেল, গ্যাস কিংবা পোশাকশিল্প নয়—ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ। স্মার্টফোন, কম্পিউটার, গাড়ি, শিল্পকারখানা, যোগাযোগব্যবস্থা থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—প্রায় সব আধুনিক প্রযুক্তির প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে এই ক্ষুদ্র চিপ। ফলে বিশ্বজুড়ে সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে এবং আগামী বছরগুলোতে এ বাজার আরও বড় হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।

এই পরিবর্তনশীল প্রযুক্তিবিশ্বে বাংলাদেশও নতুন সম্ভাবনার সন্ধান করছে। তৈরি পোশাক ও জনশক্তি রপ্তানির ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতার পাশাপাশি উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর নতুন রপ্তানি খাত গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। সেই সম্ভাবনার তালিকায় সেমিকন্ডাক্টর শিল্প ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা গেলে চিপ ডিজাইন, সেমিকন্ডাক্টর গবেষণা, পরীক্ষা, প্যাকেজিং ও অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় বাংলাদেশের বড় ধরনের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা ও বিনিয়োগের সমন্বিত উদ্যোগ।

 *সিলিকন ভ্যালির গল্পে লুকিয়ে আছে বড় শিক্ষা* 

বাংলাদেশের সামনে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের সম্ভাবনা বোঝার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালির অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। একসময় সান্তা ক্লারা উপত্যকা ছিল মূলত কৃষিনির্ভর অঞ্চল। সময়ের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি কোম্পানির সমন্বয়ে সেটিই পরিণত হয় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিকেন্দ্রে।

এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা ছিল স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিল্পখাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের স্থানীয়ভাবে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উৎসাহ দেওয়া হয়। ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত স্ট্যানফোর্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তি শিল্পের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করে।

এরপর সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বিকাশে আসে আরও বড় পরিবর্তন। উইলিয়াম শকলি ক্যালিফোর্নিয়ায় সেমিকন্ডাক্টর গবেষণার একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করা একদল মেধাবী বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী পরবর্তী সময়ে আলাদা হয়ে নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ১৯৫৭ সালে তাদের হাত ধরে জন্ম নেয় ফেয়ারচাইল্ড সেমিকন্ডাক্টর।

সেখান থেকেই শুরু হয় এক ধরনের উদ্যোক্তা-শৃঙ্খল। ফেয়ারচাইল্ডের কর্মী ও প্রকৌশলীদের একটি অংশ পরবর্তী সময়ে নতুন নতুন প্রযুক্তি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। এভাবেই একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ছড়িয়ে পড়ে অসংখ্য প্রযুক্তি উদ্যোগ।

রবার্ট নয়েস ও গর্ডন মুরের মতো বিজ্ঞানী-প্রকৌশলীদের হাত ধরে ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইনটেল। পাশাপাশি এএমডিসহ আরও বহু প্রতিষ্ঠান সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বিস্তারে ভূমিকা রাখে।

 *সরকারি চাহিদা বদলে দেয় প্রযুক্তি শিল্পের গতি* 

সিলিকন ভ্যালির প্রাথমিক বিকাশে মার্কিন সামরিক বাহিনী ও মহাকাশ কর্মসূচির চাহিদাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অ্যাপোলো মহাকাশ কর্মসূচিসহ বিভিন্ন সামরিক ও মহাকাশ প্রকল্পে নির্ভরযোগ্য ইন্টিগ্রেটেড সার্কিটের প্রয়োজন বাড়তে থাকায় স্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বড় বাজার পেয়ে যায়।

অর্থাৎ শুধু মেধা থাকলেই একটি প্রযুক্তি অঞ্চল তৈরি হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা, সরকারি চাহিদা, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনবল—সবকিছুর সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে সিলিকন ভ্যালি।

 *বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় শিক্ষা।* 

‘সিলিকন ভ্যালি’ নামটিও একটি ইতিহাস

সান্তা ক্লারা অঞ্চলের প্রযুক্তিবিপ্লবের সঙ্গে ‘সিলিকন ভ্যালি’ নামটি পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠে। সাংবাদিক ডন হফলার ১৯৭১ সালে ‘ইলেকট্রনিক্স নিউজ’-এ প্রকাশিত ধারাবাহিক প্রতিবেদনের শিরোনামে ‘Silicon Valley USA’ ব্যবহার করেন।

চিপ তৈরির অন্যতম প্রধান উপাদান সিলিকন এবং সান্তা ক্লারা অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য—এই দুইয়ের সমন্বয়েই নামটি জনপ্রিয়তা পায়। হফলারের প্রতিবেদনে তৎকালীন সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বিকাশ, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিবিদদের ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছিল।

বিশেষ করে ফেয়ারচাইল্ড সেমিকন্ডাক্টর থেকে কীভাবে একের পর এক নতুন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তৈরি হচ্ছিল, সেটি ছিল ওই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি।

 *এক শিল্প থেকে বহু প্রযুক্তিবিপ্লব* 

সিলিকন ভ্যালির ইতিহাস মূলত একটি শিল্পের ইতিহাস নয়; এটি ধারাবাহিক প্রযুক্তিবিপ্লবের ইতিহাস।

প্রথমে সেমিকন্ডাক্টর ও ইন্টিগ্রেটেড সার্কিটের বিকাশ। এরপর পার্সোনাল কম্পিউটার। তারপর ইন্টারনেট ও ডটকম ব্যবসা। পরবর্তী সময়ে সার্চ ইঞ্জিন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্মার্টফোন ও ক্লাউড কম্পিউটিং। এখন সেই একই অঞ্চল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপ্লবের অন্যতম কেন্দ্র।

এনভিডিয়া, গুগল, অ্যাপল, মেটা ও ওপেনএআইসহ প্রযুক্তির শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো এই বৃহৎ প্রযুক্তি-পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে এআইয়ের দ্রুত বিকাশের কারণে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রসেসর ও জিপিইউয়ের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে।

ফলে সেমিকন্ডাক্টর এখন শুধু ইলেকট্রনিক পণ্যের একটি উপাদান নয়; এটি হয়ে উঠেছে আধুনিক অর্থনীতি ও জাতীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অন্যতম ভিত্তি।

 *বাংলাদেশের সামনে কোন পথ?* 

বাংলাদেশের জন্য সরাসরি উন্নতমানের চিপ তৈরির কারখানা দিয়ে যাত্রা শুরু করা কতটা বাস্তবসম্মত—তা নিয়ে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। কারণ অত্যাধুনিক সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং এর জন্য প্রয়োজন বিশেষ অবকাঠামো, বিপুল বিনিয়োগ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ, অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা সক্ষমতা।

তবে পুরো শিল্পকে শুধু চিপ তৈরির কারখানার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখার সুযোগ নেই। চিপ ডিজাইন, ভেরিফিকেশন, সফটওয়্যার, এমবেডেড সিস্টেম, টেস্টিং, প্যাকেজিং, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সেবা—এসব ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের প্রবেশের সুযোগ রয়েছে।

প্রথম ধাপে দক্ষ প্রকৌশলী ও গবেষক তৈরি করা গেলে পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারত্ব, বিদেশি বিনিয়োগ এবং দেশীয় স্টার্টআপের মাধ্যমে এই খাত সম্প্রসারণ করা সম্ভব হতে পারে।

 *সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হতে হবে মানবসম্পদে* 

সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হতে পারে তরুণ প্রজন্ম। কিন্তু বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ প্রযুক্তিবিদে রূপান্তর করতে না পারলে জনসংখ্যার এই সুবিধা অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে না।

 *বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগার, শিল্পের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগ, আধুনিক কারিকুলাম, আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ এবং গবেষণায় বিনিয়োগ—এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে।* 

একই সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশি প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের সঙ্গে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের সংযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা দেশের প্রযুক্তি শিল্পে কাজে লাগাতে পারলে তা গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত হতে পারে।

 *সেমিকন্ডাক্টরকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বাংলাদেশ* 

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সেমিকন্ডাক্টর ও হাইটেক শিল্পকে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে ঢাকায় আয়োজিত জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়ামেও এই খাতের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে স্টার্টআপ ও উদ্ভাবনকে সহায়তার বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে। প্রস্তাবিত বড় আকারের স্টার্টআপ তহবিল, বিনিয়োগে প্রণোদনা এবং বিশেষ সুবিধা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পথ আরও সহজ হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন যুক্তরাষ্ট্র সফরেও সিলিকন ভ্যালিতে কর্মরত বাংলাদেশি বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর, আইটি ও স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

 *পোশাকের পর প্রযুক্তিই কি নতুন রপ্তানি ইঞ্জিন?* 

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বহুমুখী করার প্রয়োজনীয়তা এখন আর শুধু অর্থনীতিবিদদের আলোচনার বিষয় নয়। বৈশ্বিক বাণিজ্য ও প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে নতুন রপ্তানি খাত তৈরির প্রয়োজন আরও তীব্র হয়েছে।

তৈরি পোশাক ও জনশক্তি রপ্তানি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে যে ভিত্তি দিয়েছে, তার ওপর দাঁড়িয়ে এখন উচ্চপ্রযুক্তির নতুন অধ্যায় শুরু করার সুযোগ রয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর সেই সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে।

তবে স্বপ্ন দেখলেই হবে না। সিলিকন ভ্যালির অভিজ্ঞতা বলছে—একটি প্রযুক্তি শিল্প গড়ে উঠতে কয়েক দশকের ধারাবাহিক পরিকল্পনা, গবেষণা, মেধা, বিনিয়োগ এবং উদ্যোক্তা-সংস্কৃতি প্রয়োজন।

বাংলাদেশ যদি আজ থেকেই সেই দীর্ঘ পথের প্রস্তুতি শুরু করতে পারে, তাহলে আগামী দিনে চিপ ডিজাইন থেকে শুরু করে প্রযুক্তিনির্ভর রপ্তানি সেবায় দেশের তরুণরা বৈশ্বিক বাজারে জায়গা করে নিতে পারে।

 *সেমিকন্ডাক্টর তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি নতুন শিল্পের নাম নয়; এটি অর্থনীতিকে উচ্চপ্রযুক্তির দিকে নেওয়ার একটি সম্ভাব্য দরজা। সেই দরজা খুলতে হলে এখন প্রয়োজন স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবসম্মত মাস্টারপ্ল্যান, দক্ষ মানবসম্পদ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।* 

সর্বশেষ