*ঋণ পেতে সংস্কারের কঠিন পরীক্ষায় বাংলাদেশ।*
*উপশিরোনাম:* প্রবৃদ্ধি কমার পূর্বাভাস, মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী চাপ; বাজেট সহায়তা পেতে রাজস্ব ও ব্যাংক খাতে সংস্কারের চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তার সম্ভাবনা তৈরি হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে চ্যালেঞ্জ কমছে না। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, বাজেটের চাপ সামাল দেওয়া এবং সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর সহযোগিতা চাইছে সরকার। তবে সেই সহায়তা পেতে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের মতো কঠিন শর্ত পূরণ করতে হবে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সংস্কার উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ১২ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে শুরু হওয়া সপ্তাহব্যাপী সম্মেলন শেষ হয় ১৮ অক্টোবর। সম্মেলনে অর্থনৈতিক সংস্কার ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ইতিবাচক মনোভাবের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল। তবে সম্ভাব্য সহায়তার বাস্তব রূপ নির্ভর করছে সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি ও ঋণদাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনার ওপর।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পরামর্শের অপেক্ষায় না থেকে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কারণে বাজেট সহায়তা ও ঋণ পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী বাংলাদেশ।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের মতে, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বিদ্যমান সংকট থেকে উত্তরণের কৌশল এবং সরকারের অগ্রাধিকার নির্ধারণের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। এসব বিষয় আলোচনাকে সহজ করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে বাংলাদেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আন্তর্জাতিক নীতিকাঠামোয় নমনীয়তা আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছে সরকার। অর্থ উপদেষ্টার বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি অতীতের সমস্যাগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে বাজারের সঙ্গে মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এমন পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, যাতে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।
*প্রবৃদ্ধি কমার শঙ্কা, মূল্যস্ফীতির চাপ*
বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের বড় কারণ প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী পূর্বাভাস ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রাক্কলন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি প্রায় ১১ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করাও জরুরি হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু ঋণ বা বাজেট সহায়তা পেলেই অর্থনীতির সংকট দূর হবে না। রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা কাটানো, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সংস্কার আনতে হবে। এসব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে আন্তর্জাতিক সহায়তার সুফল সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকসহ বহুপক্ষীয় ঋণদাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনায় কৃষি খাতের সার ভর্তুকি এবং জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের বিষয়গুলো সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সময় নির্বাচন ও দর-কষাকষির দক্ষতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম জাহীদ মনে করেন, আইএমএফের কাছ থেকে সফলভাবে ঋণ পাওয়া গেলে দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে। তবে সেই সহায়তা অর্থনীতির জন্য কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে অর্থের ব্যবহার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর।
*সামনে আইএমএফের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা*
বাংলাদেশের জন্য পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে আইএমএফের প্রতিনিধিদলের সম্ভাব্য সফরকে। এ সফরে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সংস্কার কার্যক্রম এবং ঋণসহায়তার বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার পথ তৈরি হলেও তা এখনো নিশ্চিত প্রাপ্তিতে রূপ নেয়নি। ঋণ ও বাজেট সহায়তা অর্থনীতির ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ফেরাতে প্রয়োজন রাজস্ব ব্যবস্থার উন্নয়ন, ব্যাংক খাতে সুশাসন, কার্যকর সংস্কার এবং সাধারণ মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা।
আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা এখন সরকারের জন্য স্বস্তির জায়গা। তবে সেই সহায়তাকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত করাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
মতামত দিন