• ২০২৬ অক্টোবর ২২, বৃহস্পতিবার, ১৪৩৩ কার্তিক ৭
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৩:১০ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

জলবায়ুর আঘাতে ২০৫০ সালের মধ্যে বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিতে ১ কোটি ৩৩ লাখ বাংলাদেশি।*

  • প্রকাশিত ০৩:১০ অপরাহ্ন বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২২, ২০২৬
জলবায়ুর আঘাতে ২০৫০ সালের মধ্যে বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিতে ১ কোটি ৩৩ লাখ বাংলাদেশি।*
Time Bangla news
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ।

*জলবায়ুর আঘাতে ২০৫০ সালের মধ্যে বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিতে ১ কোটি ৩৩ লাখ বাংলাদেশি।* 


 *উপশিরোনাম:* জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি, বাড়তে পারে অভ্যন্তরীণ স্থানান্তর; উপকূলীয় দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। 

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বাংলাদেশের উপকূলীয় জনপদে বাড়ছে বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, সুপেয় পানির সংকট ও কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মতো সমস্যায় ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হতে পারেন। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষের ওপর এই ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।

এডিবির এশিয়া-প্যাসিফিক ক্লাইমেট রিপোর্ট ২০২৬: কোস্টাল রিস্ক অন দ্য রাইজ—অ্যাকশনস ফর আ রেজিলিয়েন্ট ফিউচার শীর্ষক প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের এই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রিনহাউস গ্যাসের উচ্চ নিঃসরণের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২১০০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ১ কোটি ৭৫ লাখ মানুষ উপকূলীয় প্লাবনের শিকার হতে পারেন। এতে ঘরবাড়ি, জীবিকা ও কৃষিজমি হারিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

 *সবচেয়ে বেশি বিপদে দরিদ্র জনগোষ্ঠী* 

এডিবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উপকূলগুলো বিশ্বের অন্যতম প্লাবনঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। বিশেষ করে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপের মতো ঘনবসতিপূর্ণ নদী অববাহিকায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উপকূলীয় বন্যার সবচেয়ে বড় শিকার দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। সীমিত আর্থিক সামর্থ্য, নিরাপদ আবাসনের অভাব এবং বিকল্প জীবিকার সংকটের কারণে দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের অভিঘাত দীর্ঘ মেয়াদে দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতি বছর প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ উপকূলীয় বন্যায় আক্রান্ত হতে পারেন। ২১০০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা বেড়ে ১০ কোটি ৮০ লাখে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।

 *বাড়ছে অর্থনৈতিক ক্ষতির শঙ্কা* 

উপকূলীয় বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।

এডিবির হিসাব অনুযায়ী, এ অঞ্চলে বর্তমানে উপকূলীয় প্লাবনজনিত বার্ষিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার। পর্যাপ্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে ২০৫০ সালের মধ্যে এ ক্ষতি বেড়ে ১৭২ বিলিয়ন থেকে ১৯৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ২১০০ সাল নাগাদ ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৫২০ বিলিয়ন থেকে ৭৩৯ বিলিয়ন ডলারে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উপকূলীয় সুরক্ষা জোরদার করতে বছরে ৯ বিলিয়ন থেকে ১৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হলে সম্ভাব্য বিপুল ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। এ ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে বছরে ১৭৮ বিলিয়ন থেকে ৩৬০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি ঠেকানো যেতে পারে। অর্থাৎ, পরিস্থিতি ও বিনিয়োগের ধরন অনুযায়ী প্রতি ডলার বিনিয়োগে সর্বোচ্চ ২০ ডলার পর্যন্ত সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৩০টি উপকূলীয় অর্থনীতির পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এতে সতর্ক করা হয়েছে, প্রয়োজনীয় অভিযোজন ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ২০৫০ সালের মধ্যে উপকূলীয় বন্যায় বার্ষিক ক্ষতি প্রায় ছয় গুণ এবং শতাব্দীর শেষ নাগাদ প্রায় ২০ গুণ বাড়তে পারে।

 *দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সাফল্য* 

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়লেও দুর্যোগ প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কিছু উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে এডিবি। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কবার্তা, জনসচেতনতা এবং উপকূলীয় এলাকায় বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তবে ভবিষ্যতের বাড়তি ঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু প্রচলিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট হবে না। উপকূলীয় এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।

এডিবির ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট বিভাগের মহাপরিচালক ইয়েভগেনি জুকোভের মতে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে উপকূলীয় এলাকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও তীব্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসব এলাকার অস্তিত্ব এবং মানুষের জীবনযাত্রাকে ক্রমেই ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি, অভিযোজনযোগ্য ও ঝুঁকি কমাতে সক্ষম সমাধান গ্রহণ জরুরি।

 *ঝুঁকিতে বড় শহর ও বন্দর* 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এডিবির সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ৪০ কোটিরও বেশি মানুষ সমুদ্র উপকূলের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করেন। এসব এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাসের পাশাপাশি রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর, বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও পর্যটন অবকাঠামো। ফলে উপকূলীয় দুর্যোগের প্রভাব শুধু জনজীবনে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ব্যাহত হতে পারে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও।

ব্যাংকক, জাকার্তা, কলকাতা ও মুম্বাইয়ের মতো বড় শহরগুলোও উপকূলীয় বন্যার বাড়তি ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিবেদনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এসব শহরে অতীতে যে ধরনের ভয়াবহ উপকূলীয় বন্যা শত বছরে একবার ঘটত, শতাব্দীর শেষ দিকে উচ্চ ঝুঁকির পরিস্থিতিতে তা বছরে একবার ঘটার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে এ অঞ্চলে বছরে প্রায় ৪০ বিলিয়ন থেকে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক কার্যক্রম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে সতর্ক করেছে এডিবি। উচ্চ কার্বন নিঃসরণের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২১০০ সাল নাগাদ এসব দেশের বার্ষিক বন্যাজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

 *এখনই প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা* 

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উপকূলীয় অভিযোজন কার্যক্রম বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছে এডিবি। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে ঝুঁকি মূল্যায়ন, প্রাকৃতিক প্রতিবেশ সংরক্ষণ, নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।

বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জটি শুধু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি কিংবা উপকূলীয় বন্যার ক্ষয়ক্ষতি সীমিত রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষকে নিজ বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র যেতে হলে আবাসন, কর্মসংস্থান, খাদ্যনিরাপত্তা ও নগরসেবার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হবে।

এ পরিস্থিতিতে আগাম পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও কার্যকর অভিযোজন উদ্যোগ নেওয়া না গেলে জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য পরিবেশগত সংকটের পাশাপাশি বড় ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

সর্বশেষ