প্রায় চার দশক ধরে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি–এর মৃত্যুর পর স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে একটি বড় প্রশ্ন—তার পর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের নেতৃত্ব কে দেবেন?
১৯৮৯ সাল থেকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন খামেনি। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ, সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং কৌশলগত সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত নির্ধারক ছিলেন তিনি। ইসলামী বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা রুহুল্লাহ খোমেনি–এর উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর কঠোর হাতে দেশ পরিচালনা করেন।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, খামেনি নিহত হয়েছেন। পরে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইসলামিক রিপাবলিক নিউজ এজেন্সি (IRNA) এ তথ্য নিশ্চিত করে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রেক্ষাপটে তৈরি অস্থিরতার মধ্যেই তেহরানে উত্তরসূরি নির্ধারণের আলোচনা জোরালো হয়েছে। তবে জানা গেছে, সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় খামেনি আগেই ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি পরিকল্পনা রেখে গিয়েছিলেন।
সম্ভাব্য তিন উত্তরসূরি:
গত জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের সময় আত্মগোপনে থাকাকালে খামেনি সম্ভাব্য তিনজন উত্তরসূরির নাম নির্ধারণ করেছিলেন বলে একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তারা হলেন—
* গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই – বর্তমানে ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান।
* আলী আসগর হেজাজি – খামেনির দপ্তরপ্রধান।
* হাসান খোমেনি – সংস্কারপন্থি ধারার ধর্মীয় নেতা এবং রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি।
এ ছাড়া খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি–র নামও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়েছে। তবে খামেনি নেতৃত্বকে বংশানুক্রমিক রূপ দিতে চাননি বলে জানা গেছে।
সাংবিধানিক প্রক্রিয়া:
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা হতে হলে জ্যেষ্ঠ শিয়া ধর্মতাত্ত্বিক হতে হয়। তাকে নির্বাচিত করে বিশেষজ্ঞ পরিষদ (Assembly of Experts) নামে পরিচিত ধর্মীয় পরিষদ। বিশ্লেষকদের মতে, পরিষদ দ্রুত বৈঠক ডাকলে অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন সর্বোচ্চ নেতার নাম ঘোষণা করা সম্ভব।
অন্তর্বর্তী ক্ষমতা কাঠামো:
হামলার আগে খামেনি জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানি–কে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন বলে জানা গেছে। তিনি কার্যত প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান–কে পাশ কাটিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছিলেন।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, তেহরানের পাস্তুর কমপ্লেক্সে হামলা চালানো হয়েছে—যেখানে সর্বোচ্চ নেতার বাসভবন, দপ্তর এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কার্যালয় অবস্থিত।
যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য একটি ছোট রাজনৈতিক ও সামরিক গোষ্ঠীকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। সম্ভাব্য নেতৃত্ব কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে ছিলেন আলী আসগর হেজাজি, মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এবং ইয়াহিয়া রহিম সাফাভি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি আগে বলেছিলেন, “আমাদের কিছু নেতা হারালেও সেটি বড় সমস্যা নয়। আত্মরক্ষায় আমাদের কোনো সীমা নেই।
সামনে কী?
খামেনির মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে ধর্মীয় কর্তৃত্ব, সামরিক প্রভাব এবং রাজনৈতিক ভারসাম্যের সমন্বয়েই নির্ধারিত হবে ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা কে হবেন। তবে চলমান সামরিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
তেহরানে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—কে হচ্ছেন ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা, এবং কোন পথে এগোবে দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনীতি?
মতামত দিন