• ২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৯, শনিবার, ১৪৩৩ আশ্বিন ৪
  • সর্বশেষ আপডেট : ০২:০৯ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

সিলেটে ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হলে তালা, ঝুঁকিতে অবশিষ্ট দুটিও

  • প্রকাশিত ০২:০৯ অপরাহ্ন শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
সিলেটে ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হলে তালা, ঝুঁকিতে অবশিষ্ট দুটিও
Time Bangla news
​শহীদুর রহমান জুয়েল চিফ প্রতিনিধি সিলেট

সিলেটে ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হলে তালা, ঝুঁকিতে অবশিষ্ট দুটিও


​বিনোদনের একসময়ের সবচেয়ে বড় মাধ্যম ছিল সিনেমা, আর তার মূল কেন্দ্র ছিল সিনেমা হল। একসময় শুধু উৎসবকেন্দ্রিক নয়, সারা বছরই সপরিবারে সিনেমা হলে যেতেন দর্শক।

​পারিবারিক ও সামাজিক গল্পনির্ভর চলচ্চিত্রগুলো সবাই মিলে উপভোগ করার সেই আনন্দঘন পরিবেশ, টিকিট কাটার দীর্ঘ লাইন আর ‘হাউজফুল’ সাইনবোর্ডের দৃশ্য এখন শুধুই অতীত।

​সময়ের ব্যবধানে সিলেটে একের পর এক বন্ধ হয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী সব সিনেমা হল। বর্তমানে কোনো রকমে টিকে আছে মাত্র দুটি সিনেমা হল—নন্দিতা ও বিজিবি সিনেমা হল। তবে নামমাত্র টিকে থাকা এই হলগুলোর অবস্থাও বেশ নাজুক।

​একসময় সিলেট নগরে একের পর এক সিনেমা হল জমজমাট ব্যবসা করেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, নগরীতে একসময় রংমহল, লালকুঠি, মনিকা, অবকাশ, দিলশাদ, কাকুলি ও সৈনিক ক্লাবসহ একাধিক সিনেমা হল চালু ছিল। কিন্তু একে একে সেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।

​বর্তমানে সমগ্র দেশেই সিনেমা হলের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে এসেছে। ১৯৫৬ সালে দেশে প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ মুক্তির পর প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকলেও শূন্য (২০০০) দশকের শুরু থেকে ব্যবসায় চরম ধস নামে।

​চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্টরা জানান, ওই সময়ে সিনেমা শিল্পে অশ্লীলতা জেঁকে বসায় পরিবারভিত্তিক দর্শকরা হলবিমুখ হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে অশ্লীলতা দূর হলেও মানসম্মত চলচ্চিত্রের অভাব এবং ওটিটি ও ডিজিটাল মাধ্যমের জনপ্রিয়তার কাছে টিকতে না পেরে সারা দেশের প্রায় ১,৪৭০টি হল কমে এখন সাকুল্যে মাত্র ৬০টিতে এসে ঠেকেছে। যদিও ঈদ উৎসবে সাময়িকভাবে কিছু হল চালু হয়ে সংখ্যাটি ১০০ থেকে ১৫০-এ দাঁড়ায়, উৎসব শেষে সেগুলো আবারও বন্ধ হয়ে যায়।

​সিলেটেও একই চিত্র দেখা গেছে। ঐতিহ্যবাহী হলগুলো ভেঙে এখন গড়ে উঠেছে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন ও মার্কেট। হাতেগোনা যে দুটি সিঙ্গেল স্ক্রিন কোনোমতে টিকে আছে, সেগুলোও চরম দর্শকখরা ও আর্থিক লোকসানে অস্তিত্বসংকটে ভুগছে।

​সিলেটের সিনেমাপ্রেমী জ্যেষ্ঠ দর্শকরা আক্ষেপ করে বলছেন, সিনেমা হলের স্বর্ণযুগ হারিয়ে যাওয়া কেবল ব্যবসায়ের ক্ষতি নয়, বরং শহরের সংস্কৃতি ও বিনোদনচর্চার ক্ষেত্রেও এক বড় শূন্যতা তৈরি করেছে।

​নন্দিতা সিনেমা হলের পরিচালক মোহাম্মদ কামাল হোসেন জানান, সিলেটে সিনেমা হলের এই সংকটজনক অবস্থা পুরো সংস্কৃতিকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সুস্থ বিনোদনের মাধ্যম সিনেমা না থাকলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষ পথভ্রষ্ট হয়ে নেশার দিকে ঝুঁকবে এবং সমাজ তার সুস্থ সংস্কৃতিচর্চা থেকে বঞ্চিত হবে।

​তিনি আরও বলেন, "তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে সরকারি অনুমোদন নিয়ে যখন কোনো সিনেমা মুক্তি পায়, তখন এর প্রচারের জন্য নগরের বিভিন্ন পয়েন্টে পোস্টার লাগানো হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, সিলেট সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নগরীর রাস্তাঘাট থেকে সেই পোস্টারগুলো সাথে সাথেই ছিঁড়ে ফেলা হয়। এভাবে যদি প্রচারেই বাধা দেওয়া হয়, তবে দর্শক কীভাবে সিনেমার কথা জানবে এবং আমরাই-বা কীভাবে ব্যবসার মুখ দেখব?"

​কামাল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এই বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার অভিযোগ জানিয়েও আমরা কোনো সাড়া পাচ্ছি না। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে সিনেমা হল চালিয়ে যাওয়া আমাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আমরা চাই সিনেমা হলগুলোকে আধুনিকায়ন করতে এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) পরিবেশ তৈরি করে দর্শকদের উন্নত সুবিধা দিতে। কিন্তু বছরে যদি মাত্র দুটি ভালো সিনেমা মুক্তি পায়, তবে হল সংস্কার ও চালানোর বিশাল খরচ মেটানো কীভাবে সম্ভব?"

​এ ব্যাপারে মন্তব্যের জন্য সিলেট সিটি করপোরেশনের দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তাকে মুঠোফোনে কল দেওয়া হলে তিনি রিসিভ করেননি।

সিলেট বিজিবি অডিটোরিয়াম হলের পরিচালক কামরুল আহমদ তালুকদার বলেন,আমাদের মূল লক্ষ্য মধ্যবিত্ত দর্শকরা। আজ যারা বড় বড় কথা বলছেন, তারা কি একবারও ভাবছেন একজন সাধারণ বা মধ্যবিত্ত মানুষের পক্ষে কি ৫০০ টাকা দিয়ে টিকেট কেটে সিনেমা দেখা সম্ভব? 

সবাই বলে হলের পরিবেশ সুন্দর করুন। কিন্তু আমি প্রশ্ন করতে চাই বছরে দুটি ঈদ ছাড়া সারা বছর কি কোনো ভালো সিনেমা আসে,এই যে বছরের পর বছর ভালো সিনেমার ঘাটতি, এর মধ্যে হলের মোটা অঙ্কের বিদ্যুৎ বিল, স্টাফদের বেতন আর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ খরচ আমরা কীভাবে চালাব।

​ব্যবসা না থাকার কারণেই আজ সিলেটের একের পর এক ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে। একসময়ের এতগুলো হলের মধ্যে এখন সিলেটে আমরা দুটি হল কোনো মতে টিকে আছি তবে এভাবে চলতে থাকলে আমরা কতদিন এগুলো চালু রাখতে পারব, তা বলা অসম্ভব!

​সিনেমা হল ব্যবসা আবারও চাঙ্গা হতে পারে, তবে তার জন্য প্রয়োজন মানসম্মত ও রুচিশীল ভালো গল্পের সিনেমা। নিয়মিত ভালো সিনেমা বাজারে এলে হলের পরিবেশ ও মান উন্নয়ন করাও আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে।

সর্বশেষ