*আইসিসির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া।*
*উপশিরোনাম:* ওয়াশিংটনের পদক্ষেপে উদ্বেগ জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের; আদালতের প্রতি সংহতি যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপানসহ আট দেশের।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ওয়াশিংটনের *এ পদক্ষেপের বিরোধিতা করে আদালতের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপানসহ আটটি দেশ। জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) সিদ্ধান্তটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।*
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর বড় ধরনের আঘাত। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা কার্যকর রাখার ক্ষেত্রে আইসিসি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।
যুক্তরাজ্য, কানাডা, ডেনমার্ক, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান ও নেদারল্যান্ডস এক যৌথ বিবৃতিতে মার্কিন সিদ্ধান্তের সঙ্গে দৃঢ় দ্বিমত প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচারে আদালতটির ভূমিকার প্রতি তাদের অব্যাহত সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে দেশগুলো।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তকে দুর্ভাগ্যজনক বলে উল্লেখ করেছে। পাশাপাশি আইসিসি যাতে স্বাধীনভাবে তার কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।
*আন্তর্জাতিক আইনের ওপর আঘাত বলছে আইসিসি*
যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় আইসিসি বলেছে, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আইনের শাসন ও আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করে। আদালতটির ভাষ্য, ইতিহাস একদিন এ ঘটনার মূল্যায়ন করবে।
আদালতের ডেপুটি প্রসিকিউটর নাজহাত শামীম খান জানিয়েছেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখেও আইসিসির বিচারিক কার্যক্রম বন্ধ হবে না। তবে প্রতিষ্ঠানটির ওপর আর্থিক ও প্রশাসনিক চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত আইসিসির সদস্যরাষ্ট্র বর্তমানে ১২৫টি। আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার নিশ্চিত করাই এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর বাইরে যুক্তরাষ্ট্র এই আদালতের সদস্য নয়। তবে আদালতের বিভিন্ন তদন্ত ও পদক্ষেপ নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই মতবিরোধ রয়েছে।
*কেন ক্ষুব্ধ ওয়াশিংটন*
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আইসিসির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে, আদালতটি মার্কিন সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি তৈরি করছে। আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর কর্মকাণ্ড নিয়ে আদালতের অতীত তদন্ত এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিষয়টি এ বিরোধের অন্যতম কারণ।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, আইসিসির সঙ্গে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর লেনদেন নিষিদ্ধ করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, এর উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে আদালতের বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ ঠেকানো।
রুবিও আরও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, আইসিসি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের সমাধান না করলে আদালতটির বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন প্রতিষ্ঠানটিকে 'বিপথগামী' আখ্যা দিয়ে এর কার্যক্রম বন্ধ করারও হুমকি দিয়েছে।
*আর্থিক কার্যক্রমে সংকটের আশঙ্কা*
নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য আইসিসিকে ব্যাংকিং, সফটওয়্যারসহ বিভিন্ন পণ্য ও সেবা সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এতে আদালতটির আর্থিক লেনদেন এবং দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে নিষেধাজ্ঞার কিছু বিধান কার্যকর হওয়ার আগে ছয় মাসের ছাড়ের সময় রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য, এ সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো চাইলে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ নিরসনে আলোচনার সুযোগ পাবে। এ সময় আইসিসির কার্যক্রমে অর্থায়ন অব্যাহত রাখার সুযোগও থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
এর আগে আইসিসির ১৭ জন বিচারক ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এবারের পদক্ষেপের তাৎপর্য হলো, নিষেধাজ্ঞার আওতা ব্যক্তির বাইরে আদালতটির প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক অপরাধের দায়বদ্ধতা নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও জোরালো করতে পারে। একদিকে আইসিসির স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা রক্ষার প্রশ্ন, অন্যদিকে মার্কিন চাপ—এই দুইয়ের মধ্যে আদালতটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম কতটা নির্বিঘ্ন থাকবে, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মতামত দিন