• ২০২৬ অক্টোবর ১১, রবিবার, ১৪৩৩ আশ্বিন ২৫
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৪:১০ পূর্বাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

*৮১ গম্বুজের মসজিদের নাম ষাটগম্বুজ কেন, ইতিহাসে মিলবে নানা ব্যাখ্যা।*

  • প্রকাশিত ০৫:১০ পূর্বাহ্ন রবিবার, অক্টোবর ১১, ২০২৬
*৮১ গম্বুজের মসজিদের নাম ষাটগম্বুজ কেন, ইতিহাসে মিলবে নানা ব্যাখ্যা।*
Time Bangla news
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ।

*৮১ গম্বুজের মসজিদের নাম ষাটগম্বুজ কেন, ইতিহাসে মিলবে নানা ব্যাখ্যা।* 

বাগেরহাট: স্থাপত্যের গঠন, প্রাচীন ইতিহাস আর ধর্মীয় তৎপরআবহ—সব মিলিয়ে অনন্য এক ঐতিহাসিক নিদর্শন বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদ দেখতে প্রতিদিনই ছুটে আসেন দেশ-বিদেশের পর্যটক ও ইতিহাসপ্রেমীরা। তবে মসজিদটির নাম ষাটগম্বুজ হলেও বাস্তবে এখানে গম্বুজ রয়েছে ৮১টি। কেন এমন নাম, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে রয়েছে একাধিক ব্যাখ্যা।

বাংলাদেশের বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর একটি এই মসজিদ। বাগেরহাটের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী এটি। মসজিদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলোও এ অঞ্চলের অতীত ইতিহাস ও মুসলিম স্থাপত্যের বিকাশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়।

 *খানজাহান আলীর স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা* 

ঐতিহাসিকভাবে ষাটগম্বুজ মসজিদ নির্মাণের কৃতিত্ব সুফি সাধক ও ধর্মপ্রচারক হজরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁর প্রতিষ্ঠিত খলিফাতাবাদ নগরী, যার বর্তমান অবস্থান বাগেরহাট অঞ্চলে, একসময় দক্ষিণ বাংলায় মুসলিম শাসন ও স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।

স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে খানজাহান আলী এ অঞ্চলে আসেন এবং তাঁর উদ্যোগেই নির্মিত হয় মসজিদটি। তবে নির্মাণের সুনির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য সীমিত। মসজিদের গায়ে নির্মাণকাল বা প্রতিষ্ঠাতার পরিচয় উল্লেখ করা কোনো শিলালিপি নেই বলে এর ইতিহাসের কিছু বিষয় নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

মসজিদ নির্মাণে চুন, সুরকি, ইট ও পাথরের ব্যবহার দেখা যায়। প্রাচীন নির্মাণকৌশল এবং শক্তিশালী দেয়াল এর স্থাপত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মসজিদটির নির্মাণশৈলীতে মধ্যযুগীয় মুসলিম স্থাপত্যের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

 **নাম: ষাটগম্বুজ, অথচ গম্বুজ ৮১টি** 

মসজিদটির নামকরণ নিয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো, এর ছাদ নির্মাণে ব্যবহৃত ৬০টি স্তম্ভের ধারণা থেকে নামটি এসেছে। মসজিদের অভ্যন্তরে পাথরের স্তম্ভগুলো ছাদের ভার বহন করছে। তবে গম্বুজের সংখ্যা ৬০ নয়, মোট ৮১টি।

স্থাপত্যের হিসাব অনুযায়ী, মসজিদের ছাদের ওপর সাত সারিতে ১১টি করে মোট ৭৭টি গম্বুজ রয়েছে। এর সঙ্গে চার কোণের চারটি গম্বুজ যুক্ত হয়ে মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮১টি।

নামকরণের আরেকটি ব্যাখ্যায় বলা হয়, ছাদের আকৃতি ও গম্বুজের বিন্যাস থেকে ‘ছাদগম্বুজ’ শব্দের উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে কথ্যরূপে ‘ষাটগম্বুজ’ হয়েছে। আবার ‘ষাট’ ও ‘ছাদ’ শব্দের ব্যুৎপত্তি নিয়েও বিভিন্ন মত রয়েছে। তবে এসব ব্যাখ্যার কোনটি চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত, তা নিশ্চিত করে বলার মতো পর্যাপ্ত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।

 *স্থাপত্যে প্রাচীন নির্মাণকৌশলের ছাপ* 

মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে বাইরের দিকে প্রায় ১৬০ ফুট দীর্ঘ এবং পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ১০৪ ফুট প্রশস্ত। ভেতরের দিকে দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪৩ ফুট ও প্রস্থ ৮৮ ফুট। এর দেয়াল প্রায় সাড়ে আট ফুট পুরু।

মসজিদের চার কোণে রয়েছে চারটি বুরুজ। দক্ষিণ-পূর্ব কোণের বুরুজের ভেতর দিয়ে ছাদে ওঠার সিঁড়ি রয়েছে, যা ‘রওশন কোঠা’ নামে পরিচিত। উত্তর-পূর্ব কোণের বুরুজটিও ছাদে ওঠার পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়; এটি ‘আন্ধার কোঠা’ নামে পরিচিত।

মসজিদের বিশাল অভ্যন্তরীণ পরিসর, পাথরের স্তম্ভের সারি এবং গম্বুজের বিন্যাস একে মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের উল্লেখযোগ্য নিদর্শনে পরিণত করেছে। আধুনিক নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার ছাড়াই কীভাবে এত বড় স্থাপনা তৈরি করা হয়েছিল, তা এখনো দর্শনার্থীদের আগ্রহের বিষয়।

 *বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা* 

বাগেরহাটের ঐতিহাসিক মসজিদ ও অন্যান্য স্থাপনার গুরুত্ব বিবেচনায় ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এলাকাটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ঐতিহাসিক ‘মসজিদের শহর’ হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে ষাটগম্বুজ মসজিদ ছাড়াও রয়েছে বহু প্রাচীন স্থাপনা।


এ কারণে মসজিদটি শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য ও পর্যটনশিল্পেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে বাগেরহাটের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এটি।


 *নামাজ, ঈদের জামাত ও ধর্মীয় আয়োজন* 


ষাটগম্বুজ মসজিদে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হয়। স্থানীয় মুসল্লিদের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে আসা ধর্মপ্রাণ মানুষও এখানে নামাজ পড়েন। পবিত্র রমজান মাসে তারাবির নামাজ ও ইফতারের আয়োজন থাকে। দুই ঈদে এখানে বড় জামাত অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিপুলসংখ্যক মুসল্লির সমাগম ঘটে।


মসজিদের ভারপ্রাপ্ত ইমাম মাওলানা মো. নাসির উদ্দিন জানান, মসজিদটিতে একসঙ্গে প্রায় দুই হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাশাপাশি রমজান মাসে দুই খতম তারাবির আয়োজন করা হয়। ঈদের জামাতে বাগেরহাটসহ বিভিন্ন এলাকার মুসল্লিরা অংশ নেন।


 *দর্শনার্থীদের কাছে প্রশান্তির জায়গা* 


ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখার পাশাপাশি মসজিদের পরিবেশও পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। স্থাপত্যের সৌন্দর্য, প্রাচীন দেয়াল ও শান্ত পরিবেশের কারণে অনেকেই পরিবার নিয়ে এখানে ঘুরতে আসেন।


ঢাকা থেকে আসা দর্শনার্থী রাবিব বলেন, পরিবার নিয়ে ষাটগম্বুজ মসজিদ ঘুরতে আসার ইচ্ছা অনেক দিনের। এখানে এসে সেই ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করলে অন্য রকম প্রশান্তি অনুভব করেন বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ঐতিহাসিক স্থাপনার সমন্বয় জায়গাটিকে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলেছে।


ঝালকাঠি থেকে আসা দর্শনার্থী হিমায়ল বলেন, এর আগেও তিনি ষাটগম্বুজ মসজিদে এসেছেন। প্রতিবারই জায়গাটির প্রতি নতুন করে আকর্ষণ অনুভব করেন। তাঁর ভাষ্য, আগের তুলনায় পরিবেশের উন্নতি হয়েছে। পবিত্রতা রক্ষায় মাইকিং এবং পর্যটকদের নিরাপত্তায় পুলিশের উপস্থিতিও চোখে পড়েছে।


 *নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশের নজরদারি* 


দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মসজিদের পবিত্রতা বজায় রাখতে দায়িত্ব পালন করছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। বাগেরহাট জোনের পুলিশ পরিদর্শক তারেক ফয়সাল ইবনে আজিজ জানান, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সকাল ৯টা থেকে দুই শিফটে দায়িত্ব পালন করে। মাগরিবের নামাজের পরও কেউ ভেতরে অবস্থান করলে মাইকে তাঁদের বেরিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।


 *পর্যটন থেকে রাজস্ব আয়* 


ষাটগম্বুজ মসজিদকে কেন্দ্র করে বাগেরহাটে পর্যটনশিল্পের বিকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। দর্শনার্থীদের আগমন স্থানীয় অর্থনীতি এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর সংরক্ষণ কার্যক্রমেও ভূমিকা রাখছে।


বাগেরহাট জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান মো. জায়েদ জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীদের কাছ থেকে ১ কোটি ১৪ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ খাত থেকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।


প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীন সংরক্ষিত স্থাপনাটি দেখতে নির্ধারিত সময় ও প্রবেশমূল্য অনুসরণ করতে হয়। তবে মসজিদে নামাজ আদায়ের সুযোগ এবং প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা পরিদর্শনের নিয়ম এক নয়। দর্শনার্থীদের ভ্রমণের আগে প্রবেশের সময়সূচি ও টিকিটের মূল্য সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে হালনাগাদ তথ্য জেনে নেওয়া উচিত।


ইতিহাস, ধর্মীয় আবহ ও স্থাপত্যের অনন্য সমন্বয়ে ষাটগম্বুজ মসজিদ আজও বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। নামের সঙ্গে গম্বুজের সংখ্যার এই পার্থক্য যেমন দর্শনার্থীদের কৌতূহল বাড়ায়, তেমনি এর নির্মাণকৌশল ও ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে অতীতের স্থাপত্য-ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।

সর্বশেষ