আমদানি ব্যয়ের চাপে বাড়ছে ডলারের দর
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬ | ০৩:০৭
জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে ব্যয় অনেক বেড়েছে। সে হারে বাড়ছে না ডলারের জোগান। এতে দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকা বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বড় পরিবর্তন এসেছে। ডলারের দর বেড়ে গতকাল মঙ্গলবার আন্তঃব্যাংকে ১২৪ টাকা ৩৫ পয়সায় উঠেছে। গত দুই দিন ধরে অনেক ব্যাংক ১২৪ টাকা ৭০ পয়সা পর্যন্ত দরে রেমিট্যান্স কিনেছে। পরিস্থিতি সামলাতে গতকাল ১০ কোটি ডলার বিক্রির নিলাম ডাকা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যাংকাররা জানান, নিলাম ডেকে ডলার বিক্রির প্রক্রিয়া বাতিলের সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি। তবে নোটিশে বলা হয়, নিলামে অংশ নিয়ে একটি ব্যাংক সর্বোচ্চ ২০ মিলিয়ন বা দুই কোটি ডলার এবং সর্বনিম্ন পাঁচ মিলিয়ন বা ৫০ লাখ ডলার কিনতে পারবে। আগ্রহীদের দুপুর আড়াইটার মধ্যে উন্মুক্ত দর পদ্ধতিতে অংশ নিতে হবে। ডলার কিনতে আগ্রহ দেখিয়ে অনেক ব্যাংক দরপ্রস্তাব জমা দেয়। তবে দুপুর ৩টায় জানানো হয়, এই নিলাম বাতিল করা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় মালিকানার একটি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, নিলাম ডেকে কেন বাতিল করা হয়েছে তাদের কিছু জানানো হয়নি। তবে এই পরিস্থিতি ডলার বাজারকে আরও অস্থিরতার মধ্যে ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সমকালকে বলেন, নিলাম বাতিলের বিষয়টি তাঁর জানা নেই। ডলারের দর বাড়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট মেটাতে স্পট মার্কেট থেকে অনেক বেশি দরে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। এতে ডলারের চাহিদা বেড়ে দর কিছুটা হয়তো বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আন্তঃব্যাংকে গত তিন দিন ধরে ডলারের দর ১২৪ টাকা ৩০ পয়সার বেশিতে বিক্রি হচ্ছে। গতকাল আন্তঃব্যাংকে বিক্রি হয়েছে ১২৪ টাকা ৩৫ পয়সায়। আগের দুই দিন যা ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা ছিল। এর আগে গত অক্টোবরের শুরুতে ডলারের দর ১২৩ টাকা থেকে বাড়তে বাড়তে শেষ কর্মদিবসে ১২৩ টাকা ৯৯ পয়সা হয়। এর আগে দীর্ঘদিন যা ১২২ থেকে ১২৩ টাকার ঘরে ওঠানামা করছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দেড় বছর ধরে আন্তঃব্যাংকে ডলারের দর ১২১ থেকে ১২২ টাকা ৩০ পয়সার মধ্যে স্থিতিশীল ছিল। তবে জাতীয় নির্বাচনের পর অর্থনীতিতে গতিশীলতা আসবে এমন ধারণা থেকে দর সামান্য বাড়তে শুরু করে। চলতি বছরের মার্চের শুরুতে আন্তঃব্যাংকে ডলারের দর একটু একটু করে বেড়ে ১২ মার্চ ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা হয়। গত ২৫ জুন পর্যন্ত একই দরে বেচাকেনা হচ্ছিল। পরের কর্মদিবস ২৮ জুন ১০ পয়সা বেড়ে উঠে যায় ১২২ টাকা ৮৫ পয়সায়। ৯ জুলাই পর্যন্ত একই রকম দর থাকার পর বাড়তে বাড়তে মাস শেষে তা ১২৩ টাকা ৮২ পয়সায় উঠে যায়। আগস্ট শেষে আবার নেমে আসে ১২৩ টাকায়। সেপ্টেম্বর শেষে আবার ১২৩ টাকা ১৫ পয়সা হয়।
বেসরকারি একটি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধান সমকালকে বলেন, এলএনজির দরবৃদ্ধির কারণে এখন ডলারের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। যে হারে রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও উন্নয়ন সহযোগীদের বিদেশি ঋণ ছাড় সে হারে বাড়ছে না। যে কারণে ডলারের চাহিদা বেড়ে এভাবে দর বাড়ছে। তিনি বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে এখনকার ডলার বাজারে এই খারাপ অবস্থা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি সবাই মিলে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সামলাতে হবে। অহেতুক কাউকে দোষারোপ না করে ডলারের জোগান বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। তা না হলে ২০২১-২২ সালের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ২০২১ সালের মাঝামাঝিতে ডলারের দর ৮৪ টাকা ছিল। সেটি এক বছরের মধ্যে বেড়ে ১২০ টাকা ছাড়িয়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই-অক্টোবর সময়ে প্রবাসীরা এক হাজার ১৪৬ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা ১৩ শতাংশ বেশি। আর রপ্তানি আয় ৬ শতাংশ বেড়ে এক হাজার ৭০৪ কোটি ডলার দেশে এসেছে।
গত আগস্টের পর আমদানির তথ্য হালনাগাদ করেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই-আগস্টে আমদানি ১২ দশমিক ১০ শতাংশ বেড়ে এক হাজার ২২০ কোটি ডলার খরচ হয়েছে। প্রথম দুই মাসে পেট্রোলিয়াম আমদানিতে ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণ হয়। আগের অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে যেখানে পেট্রোলিয়াম আমদানিতে ১২৫ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছিল। চলতি অর্থবছরের দুই মাসে তা ২৪৯ কোটি ডলারে উঠেছে। পরবর্তী মাসগুলোতে এ খাতে ব্যয় আরও বেড়েছে। সব মিলিয়ে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়ে ডলারের দর বাড়ছে।
ডলারের দর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে থমকে গেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ার প্রবণতা। গতকাল গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার। এর আগে গত ১ সেপ্টেম্বর যা ৩৭ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারে উঠেছিল। আর আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি বিপিএম৬ অনুযায়ী, রিজার্ভ নেমেছে ৩১ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারে। গত ১ সেপ্টেম্বর যা ছিল ৩২ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের ২৯ জুন প্রথমবারের মতো গ্রস রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের পর যা ছিল সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২১ সালের আগস্টে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রথমবারের মতো রেকর্ড ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে।
মতামত দিন