*জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর সময় ফুরোচ্ছে, বাংলাদেশের হাতে আর ১৯ বছর।*
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সামনে বড় সুযোগ তৈরি করেছে জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক কাঠামো। দেশের মোট জনসংখ্যার বড় অংশ এখন কর্মক্ষম বয়সী। ফলে নির্ভরশীল মানুষের তুলনায় উপার্জনক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি থাকায় উৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিতে এই সুবিধা পরিচিত ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক লভ্যাংশ নামে।
তবে এ সুযোগ চিরস্থায়ী নয়। বিশ্বব্যাংকের নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৪৫ সালে বাংলাদেশে কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর তা কমতে শুরু করবে। একই সময়ে বাড়বে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা। ফলে জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর জন্য বাংলাদেশের হাতে রয়েছে প্রায় ১৯ বছর।
অর্থনীতিবিদ ও জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সময়ের মধ্যে তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা, মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে না পারলে জনমিতিক সুবিধাই ভবিষ্যতে অর্থনীতির জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার ছয় দেশের চিত্র
বিশ্বব্যাংকের আটজন গবেষক ও বিশেষজ্ঞের তৈরি ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেইলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার জনসংখ্যাগত পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত ২০৩৪ সালে সর্বোচ্চ হবে। ২০৪৯ সালে এ অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশের বয়স হবে ৬৫ বছর বা তার বেশি। ২০০০ সাল থেকে জনমিতিক পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে গড়ে ০.৪ শতাংশ পয়েন্ট অবদান রেখেছে। তবে ২০২৪ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে এ অবদান কমে প্রায় ০.১ শতাংশ পয়েন্টে নেমে আসতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো দেশের জনসংখ্যার অন্তত ৭ শতাংশের বয়স ৬৫ বছর বা তার বেশি হলে দেশটিকে বার্ধক্যশীল এবং এ হার ১৪ শতাংশে পৌঁছালে বয়স্ক জনসংখ্যার পর্যায়ে ধরা হয়।
প্রতিবেদনের হিসাবে, বাংলাদেশ ২০২৭ সালে বার্ধক্যশীল জনসংখ্যার পর্যায়ে প্রবেশ করবে। ২০৫১ সালে প্রবীণ মানুষের অনুপাত ১৪ শতাংশে পৌঁছাবে। অন্যদিকে, কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত সর্বোচ্চ হবে ২০৪৫ সালে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কায় কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত ২০০৫ সালেই সর্বোচ্চ হয়েছিল। দেশটি ২০৩০ সালে বয়স্ক জনসংখ্যার পর্যায়ে যাবে। ভারতে এ দুটি সময় যথাক্রমে ২০৩৪ ও ২০৪৯ সাল, ভুটানে ২০৩১ ও ২০৪৮ এবং মালদ্বীপে ২০৩৩ ও ২০৪৪ সাল। নেপালে কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত সর্বোচ্চ হবে ২০৪৭ সালে এবং দেশটি বয়স্ক পর্যায়ে যাবে ২০৫৯ সালে।
দক্ষিণ এশিয়ায় বার্ধক্যশীল থেকে বয়স্ক জনসংখ্যায় উত্তরণে গড়ে ২৫ বছর লাগবে। অন্য উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতিতে এ সময় গড়ে ৩২ বছর। ফ্রান্সে এ পরিবর্তনে ১২৬ বছর এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৭২ বছর লেগেছিল।
*কর্মসংস্থানের ঘাটতি বড় বাধা*
জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর প্রধান শর্ত কর্মক্ষম মানুষের জন্য পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় কর্মক্ষম মানুষের মাত্র ৬০ শতাংশ কর্মরত। অন্য উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতিতে এ হার ৬৯ শতাংশ।
দক্ষিণ এশিয়ায় কর্মরত মানুষের ৮৮ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে যুক্ত। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের তুলনায় ৪৫ থেকে ৮৪ শতাংশ কম আয় করেন।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি কম। বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বছরে গড়ে কর্মসংস্থান বেড়েছে ২.৭ শতাংশ। অন্য উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে এ হার ৫.৪ শতাংশ। বিদ্যুৎ-সংকট, আমদানি শুল্কায়নে বিলম্ব, প্রশিক্ষণের ঘাটতি ও উদ্ভাবনে কম বিনিয়োগকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক।
অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ বিপুলসংখ্যক তরুণকে দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং তাঁদের জন্য উৎপাদনশীল ও মানসম্মত কাজের ব্যবস্থা করা। কিন্তু বিষয়টি এখনো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে ওঠেনি।
*নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে বাড়বে প্রবৃদ্ধি*
দক্ষিণ এশিয়ায় নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার মাত্র ৩৫ শতাংশ। একই সঙ্গে শিক্ষা ও পুষ্টির ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় ঘাটতি। এ অঞ্চলে প্রাথমিক স্কুলে যাওয়ার বয়সী প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে পাঁচ থেকে ছয়জন স্কুলে যায় না অথবা ১০ বছর বয়সেও সহজ লেখা পড়তে পারে না। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৩২ শতাংশ খর্বাকৃতির শিকার।
বিশ্বব্যাংকের মডেলভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির উন্নয়নের পাশাপাশি নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে ২০৫০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি বর্তমান ধারার তুলনায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হতে পারে। নারী-পুরুষের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের ব্যবধান পুরোপুরি দূর করা গেলে সম্ভাব্য এই ব্যবধান ১৩ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, নারীদের শিক্ষার সুযোগ ও কর্মসংস্থান বাড়লেও শোভন কাজের সুযোগ এখনো সীমিত। পারিবারিক দায়িত্ব, অনিরাপদ যাতায়াত ও কর্মপরিবেশ, শিশু পরিচর্যার অভাব এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নারীদের কর্মসংস্থানের পথে বাধা হয়ে রয়েছে।
*বাড়ছে আয়ু, বাড়ছে স্বাস্থ্য ও পরিচর্যার চাপ*
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় ২০২৩ সালে জন্ম নেওয়া একটি শিশু গড়ে ৭২ বছর বাঁচতে পারে। এর মধ্যে প্রায় ৬১ বছর কাটবে পূর্ণ স্বাস্থ্যে। এ অঞ্চলে মোট রোগের বোঝার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এখন অসংক্রামক রোগের কারণে সৃষ্টি হচ্ছে।
তবে দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতি পর্যাপ্ত নয়। চিকিৎসার বড় অংশের ব্যয় পরিবারকে নিজস্ব অর্থ থেকে বহন করতে হয়। বাংলাদেশ ও নেপালের এক-তৃতীয়াংশেরও কম প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অসংক্রামক রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার চাহিদাও বাড়বে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাবে, দক্ষিণ এশিয়ায় এ কাজে প্রয়োজনীয় কর্মীর সংখ্যা ২০২৩ সালের ১ কোটি ৩০ লাখ থেকে বেড়ে ২০৫০ সালে ৩ কোটি ১০ লাখ হতে পারে। বর্তমানে পরিবারের সদস্যদের, বিশেষ করে নারীদের, ওপর পরিচর্যার বড় দায়িত্ব থাকায় ভবিষ্যতে তাঁদের কর্মসংস্থান ও পারিবারিক সঞ্চয়ের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, তরুণ জনগোষ্ঠীকে কার্যকর মানবসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে জনমিতিক সুবিধা বোঝায় পরিণত হতে পারে। এ জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। তাঁর মতে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি নেই।
*বার্ধক্যে আর্থিক নিরাপত্তার ঘাটতি*
দক্ষিণ এশিয়ার কর্মক্ষম মানুষের মাত্র ১৭ শতাংশ সরকার-নির্ধারিত অবদানভিত্তিক পেনশন কর্মসূচিতে অংশ নেন। প্রবীণদের মধ্যে পেনশন সুবিধা পান মাত্র ১০ শতাংশ। ব্যক্তিগতভাবে বার্ধক্যের জন্য সঞ্চয় করেন প্রাপ্তবয়স্কদের মাত্র ৬ শতাংশ।
বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক অবদানভিত্তিক পেনশনব্যবস্থা নেই। ২০২৩ সালে চালু হওয়া সর্বজনীন পেনশন স্কিমও স্বেচ্ছামূলক। ফলে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক মানুষের অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তা অনিশ্চিত।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের মূল বার্তা হলো, বাংলাদেশের হাতে জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর সময় থাকলেও তা নিজে থেকে অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনবে না। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন এবং কার্যকর পেনশনব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অগ্রগতি।
এখনই কার্যকর পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে একসময় অর্থনীতির শক্তি হিসেবে বিবেচিত তরুণ জনগোষ্ঠীর বার্ধক্যই বাংলাদেশের জন্য বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
মতামত দিন