• ২০২৬ মে ০৩, রবিবার, ১৪৩৩ বৈশাখ ২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৫:০৫ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

সবার প্রিয় বাটা জুতার প্রতিষ্ঠাতা বিস্ময়কর জীবন কাহিনী ।

  • প্রকাশিত ০৬:০৫ অপরাহ্ন রবিবার, মে ০৩, ২০২৬
সবার  প্রিয় বাটা জুতার প্রতিষ্ঠাতা   বিস্ময়কর জীবন কাহিনী ।
File
রেজাউল ইসলাম আশিক

আত্মজীবনী লিখেছিলেন টমাস বাটা। কিন্তু শেষ করতে পারেননি, লেখার কাজ, তার আগেই তাঁর সময় ফুরোয় এ গ্রহে। আত্মজীবনীর নাম দেন ‘How I began’।

টমাসের জন্ম চেকোস্লোভাকিয়াতে। তাঁর মা ছিলেন ধর্মপ্রাণ ক্যাথলিক। ছেলেকে বাইবেলের পদ আবৃত্তি করে শোনাতেন। ছেলেও মুখে মুখে শিখে নিত বেশ। বছর ছয়েক যখন বয়স তখন থেকেই বাতিল চামড়া জুড়ে জুড়ে জুতো তৈরি করতেন। তবে সেসব জুতোর সাইজ একেবারে বুড়ো আঙ্গুলের মাপে। আকারে খুদে হলে কী হবে দেখতে একেবারে আসল জুতোর মতো। একেবারে নিখুঁত। এক জোড়া জুতো বানাতে সারাদিন লেগে যেত।

খেলার ছলে তৈরি জুতো কিন্তু কিনে নিয়ে যেত মানুষ। এক একটার দাম দশ ব্রিউজার। পেনির হিসেবে সে মূল্য খুব একটা খারাপ নয়! টমাসের বাবা-ঠাকুরদা সবাই পেশায় দক্ষ চর্মকার। বাবার কাছেই একটু একটু করে শিখে ১০ বছর বয়সে মাকে হারাতে হল।

ওই বয়স থেকেই টমাস জুতো তৈরিতে দিন দিন দক্ষ হয়ে উঠতে লাগলেন। বালক বয়স থেকেই জড়িয়ে গিয়েছিলেন বাবার ব্যবসার সঙ্গে। ১২ বছর যখন বয়স তখন পরিষ্কার বুঝতে পারছিলেন তাদের পেট ভরা খাবার আর ভাল থাকার এক মাত্র উপায় বাবার ব্যবসা। দু’বছর পর বাবার ব্যবসায় বিক্রির কাজটা টমাসের দায়িত্বে এসে পড়ল। কিশোর টমাস কিন্তু এক ফোঁটা ভয় পাননি।

বাসা বদল, বাবার ব্যবসা, নতুন ফলের ব্যবসায় দেখাশোনার কারণে বারবার বাধা আসায় এক সময় ছেড়ে দিলেন স্কুলের পাঠ। ধরাবাঁধা পড়াশোন থেকে মুক্তি তো মিলল কিন্তু তাতে খুব খুশি হতে পারেননি টমাস। বাড়িতে বইপত্তরের পাঠ তো নেই, বই বলতে শুধু পঞ্জিকা। তবু এক বই-ই বদলে দিয়েছিল তাঁর জীবন। সে বইয়ের নাম সচিত্র চেক জাতির ইতিহাস।

টমাসের মাথায় ক্রমশ চেপে বসছিল নিজের কিছু করার তাগিদ। ভিতর ভিতর অনুভব করতে পারছিলেন, বাবার ব্যবসায় নিজের ক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না। নিজের ভিতর খিদে ক্রমশ বাড়ছিল।

মায়ের মৃত্যুর সময় টমাসকে বেশ কিছু টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন, সেই অর্থ চাইলেন বাবার কাছে। কিন্তু তা খরচ হয়ে গিয়েছে ততদিনে। শেষ পর্যন্ত কপর্দকশূন্য অবস্থাতেই ভিয়েনা পাড়ি দিলেন টমাস। নিজের অল্প জমানো টাকা আর বোন আনার সামান্য অর্থ সাহায্যে এক আত্মীয়ের বাড়ির ছোট্ট এক চিলতে জায়গায় শুরু করলেন নিজের জুতোর ব্যবসা।

প্রথম প্রথম মিকাডো নামে এক ধরনের জুতো তৈরী করে বিক্রি করতেন। পুঁজির সবটা মাল তৈরীতে লাগিয়ে দিলেন। এদিকে বিক্রি নেই।  তারওপর লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসার কারণে পুলিশি সমস্যায় পড়তে হয়। অগত্যা ফের বাবার ব্যবসায় ফিরে যাওয়া।

বাবার ব্যবসায় কয়েক বছর ভালোভাবে হাত পাকানোর পর ১৮৯৪তে ফের টমাস মন দিলেন নিজের ব্যবসা শুরুর কাজে। এবার সঙ্গে পেলেন দাদা আন্তোনিন আর বোন আনাকে। এবার আর ভুল করলেন না। লাইসেন্স থেকে কর্মচারী সব নিয়ে শুরু হল নতুন জুতোর ব্যবসা। অস্ট্রো-হাঙ্গেরি জলিন শহরে তৈরি হল একটা ছোট্ট কারখানা। নাম ‘টি অ্যান্ড এ বাটা’।

জীবনের এখান থেকেই আসল কাহিনি শুরু হয় টমাসের। নানা বিপর্যয়, সংকট আর টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে পৌঁছতে লাগলেন বৃহত্তর ক্ষেত্রে। তবে ঘুরে দাঁড়াতে গেলে সবসময় একটা টার্নিং পয়েন্টের প্রয়োজন হয়। টমাস বাটার টার্নিং পয়েন্ট ‘ক্যানভাস শ্যু’।

টমাসের জুতো কারখানায় একদিন তৈরী হল কাপড় দিয়ে ক্যানভাস শ্যু। পৃথিবীর প্রথম কেডস জুতো। চামড়া নয়, এই জুতো তৈরী হল কাপড় দিয়ে। ধনী দরিদ্র সকলেই কিনতে পারবে ক্যানভাস শ্যু। 

টমাস সাহেব আরও ভাল করে প্রোডাকশন বুঝতে চলে আসেন আমেরিকায়। যন্ত্রপাতি, উৎপাদন আর সমস্যার সহজ সমাধান এই তিনটি জিনিস শেখার সঙ্গে সঙ্গে আরও একটি নিজিস শিখলেন- নিজের কারখানার কর্মীদের সঙ্গে ব্যবহারের সহবত, শ্রদ্ধা আর সম্মান। বুঝেছিলেন সাফল্য আসে টিমওয়ার্ক থেকেই।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মিলিটারিদের জুতো তৈরীর বরাত পেয়েছিলেন সেই থেকেই সাফল্যের শিখরে ওঠে টমাস সাহেবের সংস্থা।

পাইকারী হারে জুতা নির্মাণের ক্ষেত্রে বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান হিসাবে বাটা ছিলো অগ্রদূত।

টমাস বাটা তার সমাজ সচেতনতার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি তার কর্মীদের জন্য বাসস্থান, সিনেমাহল, এবং অন্যান্য সেবার ব্যবস্থা করেন। টোমাস বাটাকে এই কারণে অনেক সময় "পূর্ব ইউরোপের হেনরি ফোর্ড" বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে।

১৯৩২ সালে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে এক বিমান দূর্ঘটনায় টমাস বাটা বার্লিন বিমানবন্দরে মারা যান। তার সৎভাই জ্যান আন্টোনিন বাটা এই কোম্পানির দায়িত্ব নেন। সেসময় বাটা কোম্পানিতে নিযুক্ত ছিলো ১৬,৫৬০ জন কর্মী আর ২৭টি কারখানা। এর প্রায় সবটাই অবস্থিত ছিলো বোহেমিয়া-মোরাভিয়া এলাকায় এবং স্লোভাকিয়ায়। এর বাইরে সারা বিশ্ব জুড়ে বাটার ২০টি কারখানা, ১৩২টি দোকান এবং ৭৯০ জন কর্মী ছিলো।

জ্যান আন্টোনিন বাটার অধীনে বাটা কোম্পানির দ্রুত প্রসার ঘটে। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, এশিয়া, এবং উত্তর আফ্রিকা মহাদেশ জুড়ে বাটার জুতা জনপ্রিয় হয়ে উঠে। এসময় বাটা কোম্পানির সদরদপ্তর ও সর্ববৃহৎ স্থাপনা ছিলো য্‌লিন শহরেই। জুতা উৎপাদন ছাড়াও বাটা টায়ার, খেলনা, ও প্লাস্টিকের তন্তুও উৎপাদন শুরু করে।

১৯৩০ এর দশকে জ্যান বাটা বোহেমিয়া ও মোরাভিয়া এলাকার কারখানা ও দোকানপাটের সংখ্যা বৃদ্ধি করেন। আগের চাইতে দ্বিগুণ হয়ে কর্মীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৮ হাজারে, আর ২২০০টি দোকান ও ৭০টি কারখানা এই এলাকায় চালু হয়। স্লোভাকিয়াতে ২৫০ জন কর্মী থেকে বেড়ে মোট কর্মীর সংখ্যা হয় ১২,৩৪০ আর কারখানার সংখ্যা হয় ৮টি।

৩০ এর দশকে বিশ্বজুড়ে মন্দা দেখা দেয়। তা সত্ত্বেও জ্যান বাটা চেকোস্লোভাকিয়া ও বিশ্বজুড়ে তার ব্যবসার আকার প্রায় ৬ গুণ বাড়ান। ১৯৩২ থেকে ১৯৪২ এর মধ্যে বাটা কোম্পানির মোট কর্মীর সংখ্যা বেড়ে হয় ১০৫,৭৭০ জন। ১৯৩০ এর দশকে ইউরোপের অর্থনৈতিক মন্দার কারণে চেকোস্লোভাকিয়াতে উৎপাদিত জুতা বিদেশে রপ্তানি করা ব্যয়বহুল হয়ে পড়ায় ব্রাজিল, ব্রিটেন, ও কানাডাতে বাটার কারখানা ও শাখা চালু করা হয়।

১৯২৫ থেকে ভারতে শুরু হয় বাটার জুতোর আমদানি। চেকোশ্লোভাকিয়া থাকা আসা জুতোর দামও সময়ের হিসেব অনুযায়ী ছিল অনেকটাই। গড়ে ৭ থেকে ১০ টাকা। এমন সময়ের কথা যখন মানুষ ১০ টাকা মাস মাইনেতে নতুন সংসার পাতার সাহস পেত। ১৯৩৩-এ ভারতে প্রথম বাটার কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। হুগলির কোন্ননগরে। টমাস সাহেবের পুত্রের দ্বারা। কারণ তার ঠিক এক বছর আগেই সুইজারল্যান্ডে সংস্থার শাখা উদ্বোধন করতে গিয়ে বিমান দুর্ঘটনায় প্রয়াত হন টমাস সাহেব।

আজও বাঙালি পুজো এলে নতুন জুতো কেনার সময় বলে সেই লাইন- ‘পুজোয় চাই নতুন জুতো’। খবরের কাগজের পাতা থেকে বেরিয়ে আসে টুকটুকে লাল ক্যানভাস জুতো পায়ে দেওয়া বাঙালির শিশুকাল। প্রেমিকার জন্য অপেক্ষা চলে বাটার মোড়ে। বাস আসে, যাবে অন্য কোথাও সেখানেও পেয়ে যাবে কোন ‘বাটা স্টপেজ’...


বাটা জুতা মালিকের জীবনী

- টমাস জে বাটা

(৩ এপ্রিল, ১৮৭৬ - ১২ জুলাই, ১৯৩২)

------------------------------------

সর্বশেষ