*পাঁচ বছরেও অমলিন ডঃ ইনামুল হক।*
*উপশিরোনাম:* মঞ্চ থেকে টেলিভিশন, নাট্যাঙ্গন থেকে শ্রেণিকক্ষ—অভিনয়, নাট্যরচনা ও শিক্ষকতায় উজ্জ্বল এক জীবন।
অভিনয়, নাট্যরচনা, নির্দেশনা ও শিক্ষকতা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজের মেধা ও কর্মদক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন ইনামুল হক। মঞ্চ ও টেলিভিশনের পরিচিত এই অভিনেতার জীবনাবসান হয়েছিল আকস্মিকভাবে। ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর রাজধানীর বেইলি রোডের বাসায় চেয়ারে বসে বিশ্রাম নেওয়ার সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ৭৮ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। আজ তাঁর পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী।
দীর্ঘ কর্মজীবনে ইনামুল হক শুধু একজন অভিনেতা হিসেবেই পরিচিতি পাননি; নাট্যকার, নির্দেশক, নাট্য সংগঠক ও শিক্ষাবিদ হিসেবেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তাঁর প্রয়াণের পাঁচ বছর পরও মঞ্চনাটক ও টেলিভিশনে তাঁর কাজ দর্শক ও সহকর্মীদের স্মৃতিতে অমলিন।
**ফেনী থেকে ম্যানচেস্টার, তারপর শিল্প ও শিক্ষার জগৎ*
১৯৪৩ সালের ২৯ মে ফেনী সদর উপজেলার মোটবী ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন ইনামুল হক। তাঁর বাবা ওবায়দুল হক এবং মা রাজিয়া খাতুন। শৈশবেই মাকে হারানোর পর ফুফুর কাছে বেড়ে ওঠেন তিনি। ফুফার চাকরির কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকার অভিজ্ঞতা তাঁর শৈশবকে বৈচিত্র্যময় করে তোলে।
ফেনী পাইলট হাইস্কুলে মাধ্যমিকের পড়াশোনা শেষ করে ঢাকার নটর ডেম কলেজে ভর্তি হন তিনি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়াশোনা করেন এবং পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। এই আগ্রহই তাঁকে ধীরে ধীরে যুক্ত করে বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের সঙ্গে।
*কলেজের মঞ্চ থেকে নাট্যাঙ্গনে প্রতিষ্ঠা*
নটর ডেম কলেজে পড়ার সময় ফাদার গাঙ্গুলীর নির্দেশনায় ‘ভাড়াটে চাই’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর মঞ্চযাত্রা শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ডাকসুর হয়ে মঞ্চনাটকে অভিনয় করেন তিনি।
১৯৬৮ সালে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন ইনামুল হক। দলটির হয়ে ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’, ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’ ও ‘নূরুলদীনের সারাজীবন’- তার উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয় নাটক রঙের মেলা, নাটকটি পরিচালনা করেছিলেন জনপ্রিয় পরিচালক মোশারফ হোসেন লিটন, নাটকটি এশিয়ান টিভিতে দর্শকের মাঝে অনেক জনপ্রিয় হয়, এছাড়াও অনেক উল্লেখযোগ্য নাটকে অভিনয় করেন।
পরবর্তী সময়ে ১৯৯৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নাগরিক নাট্যাঙ্গন। মৃত্যুর আগপর্যন্ত দলটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অভিনয়ের পাশাপাশি নাট্যদল গঠন ও নাট্যচর্চার প্রসারে তাঁর উদ্যোগ বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য হয়ে আছে।
*নাট্যকার হিসেবেও ছিল স্বতন্ত্র পরিচয়*
মঞ্চে অভিনয়ের পাশাপাশি টেলিভিশনের জন্য নাটক লিখেছেন ইনামুল হক। ১৯৬৮ সালে তাঁর লেখা ‘অনেকদিনের একদিন’ বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়। টেলিভিশনের জন্য প্রায় ৬০টি নাটক রচনা করেন তিনি।
‘সেইসব দিনগুলি’, ‘নির্জন সৈকতে’ ও ‘কে বা আপন কে বা পর’ তাঁর উল্লেখযোগ্য নাট্যকর্মের মধ্যে রয়েছে। মঞ্চনাটকের পাশাপাশি টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন তিনি। চরিত্রের বৈচিত্র্য এবং অভিনয়ের স্বাভাবিকতায় দর্শকের কাছে নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তুলেছিলেন এই শিল্পী।
*৪৩ বছরের শিক্ষকতা জীবন*
অভিনয় ও নাট্যচর্চার পাশাপাশি ইনামুল হকের আরেকটি বড় পরিচয় ছিল শিক্ষকতা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) দীর্ঘ ৪৩ বছর শিক্ষকতা করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে ১৫ বছর এবং ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন হিসেবে দুই বছর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে অধ্যাপক হিসেবে অবসর নেন।
বিজ্ঞান ও শিল্প—দুটি ভিন্ন জগতের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে কর্মজীবন কাটিয়েছেন তিনি। একদিকে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, অন্যদিকে নাটকের মঞ্চ ও টেলিভিশনে সক্রিয় উপস্থিতি—তাঁর বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে।
*শিল্পী পরিবারেও রেখে গেছেন উত্তরাধিকার*
ইনামুল হকের স্ত্রী লাকী ইনাম দেশের পরিচিত অভিনেত্রী ও নাট্যব্যক্তিত্ব। তাঁদের দুই মেয়ে হৃদি হক ও প্রৈতি হক। পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও নাটক ও অভিনয়ের চর্চা রয়েছে। মেয়ে হৃদি হক অভিনয় ও নির্দেশনার সঙ্গে যুক্ত। পরিবারের এই শিল্পসংশ্লিষ্টতা ইনামুল হকের সাংস্কৃতিক জীবনকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
*রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও অমলিন স্মৃতি*
নাটক ও সংস্কৃতিতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১২ সালে একুশে পদক এবং ২০১৭ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন ইনামুল হক।
২০২১ সালের ১১ অক্টোবর তাঁর আকস্মিক প্রয়াণে বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গন হারায় একজন অভিজ্ঞ অভিনেতা, নাট্যকার, নির্দেশক ও সংগঠককে। তাঁর জীবন ছিল শিল্পচর্চা ও পেশাগত দায়িত্ব পালনের এক অনন্য সমন্বয়।
মৃত্যুর পাঁচ বছর পরও তাঁর অভিনয়, নাট্যরচনা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের স্মৃতি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রাসঙ্গিক। মঞ্চের আলো থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ—দুই ক্ষেত্রেই নিজের দক্ষতা ও নিষ্ঠার পরিচয় রেখে যাওয়া ইনামুল হক তাই শুধু একজন অভিনেতা নন, বাংলাদেশের শিল্প ও শিক্ষাজগতের এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব।
মতামত দিন