• ২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৮, সোমবার, ১৪৩৩ আশ্বিন ১২
  • সর্বশেষ আপডেট : ১২:০৯ পূর্বাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

*ট্যানারি বর্জ্যেই রপ্তানি পণ্য, সাভারে চীনা বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত* ।

  • প্রকাশিত ০২:০৯ পূর্বাহ্ন সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬
*ট্যানারি বর্জ্যেই রপ্তানি পণ্য, সাভারে চীনা বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত* ।
Time Bangla news
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ।

*ট্যানারি বর্জ্যেই রপ্তানি পণ্য, সাভারে চীনা বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত* । 

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । 

সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর ট্যানারি বর্জ্য একসময় ছিল পরিবেশের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ। রাসায়নিকযুক্ত কঠিন বর্জ্য যথাযথ ব্যবস্থাপনা ছাড়া ফেলে রাখায় দূষিত হতো আশপাশের পরিবেশ। সেই বর্জ্যই এখন পরিণত হচ্ছে মূল্যবান শিল্পপণ্যের কাঁচামালে। তৈরি হচ্ছে প্রোটিন পাউডার ও জেলটিন, যার একটি অংশ যাচ্ছে বিদেশের বাজারে।

 *চীনের ওয়েনঝো ইউয়ানফেই গ্রুপ* বাংলাদেশে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে দুটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ট্যানারি থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে শিল্প ও ওষুধ খাতের উপযোগী পণ্য উৎপাদন করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর থেকে এখন পর্যন্ত চীন, কম্বোডিয়াসহ বিভিন্ন দেশে প্রায় ১৫ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে জেলটিনের পরিমাণ প্রায় ১৩ লাখ ডলার এবং প্রোটিন পাউডারের পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ডলার।

এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো একটি চিঠির তথ্য অনুযায়ী, হংকং থেকেও সম্প্রতি প্রায় ৪ লাখ ডলারের জেলটিনের ক্রয়াদেশ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও কাগজপত্র সম্পন্ন হলে তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও পণ্য পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

 *বর্জ্য থেকে শিল্পপণ্য* 

ওয়েনঝো ইউয়ানফেই গ্রুপের আওতাধীন বাংলাদেশ জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন কোম্পানি লিমিটেড এবং ইয়ংলি বায়োটেকনোলজি কোম্পানি লিমিটেড সাভার চামড়া শিল্পনগরীর আশপাশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

প্রায় ১০০ কোটি টাকার বিদেশি বিনিয়োগে স্থাপিত এসব কারখানায় গত বছর থেকে রপ্তানিমুখী উৎপাদন শুরু হয়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে নিবন্ধিত ইয়ংলি বায়োটেকনোলজি মূলত শিল্পে ব্যবহারের জন্য প্রোটিন পাউডার উৎপাদন করে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কাঁচামালের মধ্যে রয়েছে ট্যানারি শিল্পনগরী থেকে সংগ্রহ করা ওয়েট ব্লু ডাস্ট, চামড়ার ছাঁটসহ বিভিন্ন কঠিন বর্জ্য।

গ্রুপটির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন ২০২৩ সালে ওয়েনঝো ইউয়ানফেই ও পিংইয়াং গ্রুপের যৌথ চীনা বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত হয়। কারখানায় আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি বর্জ্য শোধনের জন্য এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা ইটিপি রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক ৫ হাজার টন জেলটিন উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এই উৎপাদনের সম্ভাব্য বৈদেশিক বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখ ডলার। পাশাপাশি ট্যানারি বর্জ্য থেকে শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী প্রোটিন পাউডারও উৎপাদন করা হচ্ছে।

দুটি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে বছরে প্রায় ১৫ হাজার টন ট্যানারি বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। পরে আধুনিক প্রযুক্তিতে তা প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হয় রপ্তানিযোগ্য জেলটিন ও শিল্প প্রোটিন পাউডার।

 *কর্মসংস্থান ও পরিবেশে ইতিবাচক প্রভাব* 

প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রুপ ম্যানেজিং ডিরেক্টর মো. মাসুদ হোসেন খান বলেন, দেশে বর্তমানে এ ধরনের বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করে পণ্য তৈরির ব্যবসায় তাদের প্রতিষ্ঠানই কার্যত একমাত্র সক্রিয় কোম্পানি।

তার ভাষ্য, আগে ট্যানারির বিভিন্ন কঠিন বর্জ্য খোলা জায়গায় পড়ে থেকে পরিবেশ দূষণ করত। এখন সেগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন করা হচ্ছে। এতে একদিকে পরিবেশের ওপর চাপ কমছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তিনি জানান, তাদের কারখানাগুলোতে এরই মধ্যে প্রায় এক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

মাসুদ হোসেন খান বলেন, চামড়া শিল্পনগরীতে উৎপন্ন সব ধরনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) শিল্পনগরীর ভেতরে জায়গা দিলে ফ্লেশিংসহ আরও কিছু কঠিন বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে।

চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার সময় পশুর চামড়ার ভেতরের অতিরিক্ত চর্বি, টিস্যু ও মাংস কেটে ফেলার পর যে উপজাত তৈরি হয়, সেটিই মূলত ফ্লেশিং।

 *কাঁচামালের সংকটের শঙ্কা* 

উৎপাদন ও রপ্তানিতে সম্ভাবনা তৈরি হলেও কাঁচামালের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। বিশেষ করে গরুর কাঁচা চামড়ার ছাঁট রপ্তানি হলে দেশে জেলটিন উৎপাদনের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংকুচিত হতে পারে বলে মনে করছে তারা।

জুনের শেষ দিকে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে সাভার চামড়া শিল্পনগরী থেকে গরুর চামড়ার ছাঁট রপ্তানি বন্ধের দাবি জানায় জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন। একই সঙ্গে দেশীয় জেলটিন উৎপাদন ও বিদেশি বিনিয়োগ সুরক্ষায় সরকারি পদক্ষেপ চাওয়া হয়।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ ইতোমধ্যে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের লক্ষ্যে ইউএস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) নিবন্ধন এবং হালাল ও জিএমপি-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়াও তারা এগিয়ে নিয়েছে।

কোম্পানির হিসাব অনুযায়ী, বছরে ৫ হাজার টন জেলটিন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে প্রায় ৩০ হাজার টন গরুর কাঁচা চামড়ার ছাঁট প্রয়োজন। অথচ দেশে বছরে এ ধরনের ছাঁট উৎপাদনের পরিমাণ আনুমানিক ২০ হাজার টন। ফলে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগাতেই কাঁচামালের ঘাটতি রয়েছে।

এর মধ্যে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে চামড়ার ছাঁট রপ্তানি শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

 *আমদানি কমানোর সুযোগ* 

প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫ লাখ ডলারের জেলটিন আমদানি হয়েছে। একই বছর ক্যাপসুলের আবরণ তৈরিতে ব্যবহৃত উপকরণ আমদানি হয়েছে প্রায় ১৯ লাখ ৮০ হাজার ডলারের।

বর্তমানে দেশের ওষুধ শিল্পে ক্যাপসুলের আবরণ তৈরিতে জেলটিনের ব্যবহার রয়েছে। পাশাপাশি শিল্প প্রোটিন পাউডার প্রক্রিয়াজাত চামড়াকে নরম করার কাজে ব্যবহৃত হয়। ফলে দেশে উৎপাদন বাড়লে এসব পণ্যের আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ রয়েছে।

গত বছরের এপ্রিলে ট্যানারি বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ আরও সহজ করতে ঢাকা ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট ওয়েস্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকও সই করে জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম শাহনেওয়াজের মতে, ট্যানারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 *সামনে বড় বাজারের সম্ভাবনা* 

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশ সাতটি দেশে প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার ৪৪৬ ডলারের জেলটিনের খালি ক্যাপসুল রপ্তানি করেছে। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে এর স্থানীয় বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

তবে বছরভেদে রপ্তানির পরিমাণে ওঠানামা দেখা গেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি ছিল ৭২ হাজার ৪০৮ ডলার। পরের অর্থবছরে তা কমে ৩২ হাজার ৫২৫ ডলারে নামে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আবার বেড়ে দাঁড়ায় ৬৭ হাজার ১৮৯ ডলারে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে ২৩ হাজার ৩২৪ ডলারের পণ্য।

 *বর্তমান রপ্তানি পরিমাণ* বাংলাদেশের সামগ্রিক বাণিজ্যের তুলনায় ছোট হলেও বাজারের গন্তব্য পরিবর্তনের বিষয়টি খাতটির সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, জার্মানি ও মেক্সিকো বাংলাদেশের খালি ক্যাপসুলের ক্রেতা হয়েছে। সর্বশেষ অর্থবছরে মোট রপ্তানির প্রায় ৯৪ শতাংশ গেছে মেক্সিকোতে।

 *বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান* মার্কেটসঅ্যান্ডমার্কেটসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিশ্বে খালি ক্যাপসুলের বাজার ২০২৫ সালের প্রায় ৩১৯ কোটি ডলার থেকে ২০৩০ সালে প্রায় ৪১৯ কোটি ডলারে উন্নীত হতে পারে। অর্থাৎ আগামী কয়েক বছরে এ বাজারে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।

পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য, বিশেষায়িত সাপ্লিমেন্ট, ওষুধ শিল্পের গবেষণা ও উন্নয়ন এবং নতুন ধরনের ক্যাপসুলের ব্যবহার বৃদ্ধিকে এ বাজার সম্প্রসারণের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছে বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি।

সব মিলিয়ে সাভারের ট্যানারি বর্জ্য এখন শুধু পরিবেশগত বোঝা নয়; সঠিক ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে তা শিল্পের কাঁচামাল, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস এবং নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। তবে এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো এবং নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সর্বশেষ