*অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ‘থ্রি-স্টেপ’ পরিকল্পনা ।*
*উপশিরোনাম:* গোয়েন্দা তথ্য, সিসিটিভি ও এআই নজরদারিতে জোর; থানায় অপারেশন-তদন্ত আলাদা করার প্রস্তাব।
২৮.০৯.২০২৬
সহিংস অপরাধ, কিশোর গ্যাং, মাদক, সংঘবদ্ধ অপরাধ, মানব পাচার ও অনলাইন জালিয়াতির মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নতুন কৌশল গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ। ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত দেশের অপরাধ পরিস্থিতির তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে।
পুলিশের কার্যক্রমকে আরও দ্রুত, প্রযুক্তিনির্ভর ও গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক করার পাশাপাশি থানার দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস, নজরদারি বাড়ানো এবং বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে পরিকল্পনায়। এক থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ ব্যবস্থাপনা শাখার ডিআইজি মোহাম্মদ আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে সাত সদস্যের কমিটি এ পরিকল্পনা তৈরি করে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জোরদারের লক্ষ্যে গঠিত উপকমিটিগুলোর অংশ হিসেবে তারা কাজ করেছে।
কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বছরে গড়ে ৩ হাজার ৩১৮টি হত্যা মামলা হয়। জমি নিয়ে বিরোধ, রাজনৈতিক ও দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তার এবং গণপিটুনিকে এসব হত্যাকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্রও উদ্বেগজনক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরে গড়ে ২০ হাজার ৪৭০টি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়। এর মধ্যে ধর্ষণের মামলা গড়ে ৫ হাজার ৪৩৮টি। ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ রয়েছে বছরে গড়ে ৪৮টি ঘটনায়।
শহরাঞ্চলে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারকে নতুন ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে কমিটি। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার ও সড়ক সহিংসতার পাশাপাশি এসব অপরাধচক্রের সঙ্গে সাইবার অপরাধের যোগসূত্রও তৈরি হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অপরাধের অন্যান্য পরিসংখ্যানও পরিস্থিতির ব্যাপকতা তুলে ধরেছে। দেশে বছরে গড়ে ৯ হাজার ১৭৮টি চুরি, ২ হাজার ৭৩৩টি ডাকাতি, ১ হাজার ৩৩৩টি ছিনতাই এবং ৪৪৫টি দস্যুতার মামলা হয়। শুধু ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় বছরে গড়ে ৪৮ জনের প্রাণহানি ঘটে।
২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোটরসাইকেল ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা ব্যবহার করে ১ হাজার ১০৬টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৭২ জন। একই সময়ে অপহরণের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৩ হাজার ১১২টি।
মাদক অপরাধও পুলিশের জন্য বড় চাপ হিসেবে উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। দেশে বছরে গড়ে ৬৮ হাজার ৬৪১টি মাদক মামলা হয়। ইয়াবা পাচারের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম এবং হেরোইনের ক্ষেত্রে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ময়মনসিংহকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মানব পাচারের মামলাও কয়েক বছরে বেড়েছে। ২০২২ সালে যেখানে ৬৯৭টি মামলা হয়েছিল, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১২৬টিতে। পাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে মানুষের মৃত্যুর বিষয়টিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ১০ হাজার ১০৭টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে। তবে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের একটি অংশ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এসব অস্ত্র ভবিষ্যতে হত্যা, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ অপরাধে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কায় দ্রুত উদ্ধারের ওপর জোর দিয়েছে কমিটি।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত অনলাইন জুয়া সংক্রান্ত ২৭৯টি মামলা করেছে পুলিশ। নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে ২০২৫ সালে ৪৩ হাজার ৮২১টি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ১৫ মে পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৪৬৪টি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের তথ্যও প্রতিবেদনে রয়েছে।
*প্রথম ধাপে তাৎক্ষণিক নজরদারি ও অভিযান*
পরিকল্পনার প্রথম ধাপে আগামী এক বছরের মধ্যে পুলিশের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম আরও সক্রিয় করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে টহল জোরদার, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি স্থাপন এবং থানায় দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনা চালুর কথা বলা হয়েছে।
অভিযানের সময় বডি ক্যামেরা ব্যবহার এবং অনলাইনভিত্তিক নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সংঘবদ্ধ অপরাধীদের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান পরিচালনার সুপারিশ করা হয়েছে। অপরাধীদের বিষয়ে সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার তৈরির প্রস্তাবও রয়েছে।
কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে ফৌজদারি কার্যবিধির ১১০ ধারা এবং বেঙ্গল পুলিশ রেগুলেশনের ৬২৮ বিধি প্রয়োগের সুপারিশ করেছে কমিটি।
*দ্বিতীয় ধাপে বিশেষায়িত ইউনিট*
এক থেকে দুই বছরের মধ্যে দ্বিতীয় ধাপে সারা দেশে সিসিটিভি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ৯৯৯ জাতীয় জরুরি সেবা ও অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।
অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ঘটনাস্থল দ্রুত সুরক্ষিত ও আলামত সংগ্রহের জন্য পৃথক ইউনিট গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। জেলা ও মহানগর পর্যায়ে সাইবার অপরাধ ইউনিট এবং জেলা পর্যায়ে মাদকবিরোধী সেল গঠনের সুপারিশও রয়েছে।
অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তকরণে স্বয়ংক্রিয় তথ্যভাণ্ডার, সাক্ষীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থাপনা ডেস্ক এবং মামলার অগ্রগতি ও আদালতের কার্যক্রম সম্পর্কে স্বয়ংক্রিয় এসএমএস পাঠানোর ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।
*তৃতীয় ধাপে প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিং*
দুই থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে তৃতীয় ধাপে অপরাধপ্রবণ এলাকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সিসিটিভি নজরদারি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তদন্ত কার্যক্রমকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনতে ‘ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম’ চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে পর্যাপ্ত কম্পিউটার ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম সরবরাহের পাশাপাশি থানার দায়িত্বকে অপারেশন ও তদন্ত—এই দুই পৃথক শাখায় ভাগ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
অপরাধের ঘটনাস্থলে ব্যবহারের জন্য বিশেষায়িত যানবাহন, মরদেহ পরিবহনে ফ্রিজিং ভ্যান, আধুনিক আলামত সংরক্ষণাগার এবং তদন্তের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির প্রস্তাবও পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে।
পুলশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অপরাধ ও অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশগুলোর কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। যেসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে, সেগুলো নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নতুন এই পরিকল্পনায় তাৎক্ষণিক পুলিশি তৎপরতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত, গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোতে পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মতামত দিন