• ২০২৬ অগাস্ট ২৭, বৃহস্পতিবার, ১৪৩৩ ভাদ্র ১১
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:০৮ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

দুই দশক পর আবারও আলোচনার কেন্দ্রে ফুলবাড়ী কয়লাখনি

  • প্রকাশিত ০২:০৮ পূর্বাহ্ন বৃহস্পতিবার, অগাস্ট ২৭, ২০২৬
দুই দশক পর আবারও আলোচনার কেন্দ্রে ফুলবাড়ী কয়লাখনি
টাইম বাংলা নিউজ
মোয়াজ্জেম হোসেন, দিনাজপুর জেলা প্রতিনিধি

২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর দিন। ওইদিন উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের পরিকল্পনার প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছিলেন স্থানীয়রা। আন্দোলনকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে তিনজন নিহত ও শতাধিক মানুষ আহত হন। পরে টানা আন্দোলনের মুখে ৩০ আগস্ট তৎকালীন সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ছয় দফা সমঝোতা হয়।

চুক্তিতে এশিয়া এনার্জির সঙ্গে চুক্তি বাতিল, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন না করা, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু দুই দশক পরও চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ আন্দোলনকারীদের।

এদিকে ফুলবাড়ী আন্দোলনের ২০ বছর পূর্তির ঠিক আগেই আবারও আলোচনায় এসেছে কয়লাখনি। দেশের চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান প্রসঙ্গে সম্প্রতি রাজধানীতে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজছে এবং ফুলবাড়ীসহ বিভিন্ন স্থানে ওপেন-পিট পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের দিকে যাচ্ছে।

মন্ত্রীর এ বক্তব্যে নতুন করে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে ফুলবাড়ীতে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—তাহলে কি আবারও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বাজার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনের আলোচনায় এখন প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে ২০০৬ সালের সেই আন্দোলন।

যে ঘটনায় রক্তাক্ত হয়েছিল ফুলবাড়ী

২০০৬ সালে বহুজাতিক কোম্পানি এশিয়া এনার্জির প্রস্তাবিত উন্মুক্ত পদ্ধতির কয়লা খনি নিয়ে ফুলবাড়ী ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়। স্থানীয়দের আশঙ্কা ছিল, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কৃষিজমি ও বসতভিটা হারিয়ে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হবেন। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানি, পরিবেশ ও কৃষিনির্ভর জীবন-জীবিকায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কাও ছিল।

এর বিপরীতে প্রকল্পের সমর্থকেরা কয়লা উত্তোলনকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি করেছিলেন। এ বিরোধের মধ্যেই ২৬ আগস্ট এশিয়া এনার্জির ফুলবাড়ী কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি দেওয়া হয়। ফুলবাড়ী ছাড়াও বিরামপুর, পার্বতীপুর ও নবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো মানুষ এতে অংশ নেন।

একপর্যায়ে পরিস্থিতি সংঘর্ষ ও রক্তপাতের দিকে গড়ায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে তিন আন্দোলনকারী নিহত হন এবং আহত হন বিপুলসংখ্যক মানুষ। এরপর আন্দোলন আরও ছড়িয়ে পড়ে। সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়।

চার দিনের আন্দোলনের পর ৩০ আগস্ট সরকারের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ছয় দফা সমঝোতা হয়। সেই চুক্তিই পরবর্তী সময়ে ফুলবাড়ী আন্দোলনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

২০ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি ছয় দফা

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ছয় দফা চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতিগুলো এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষ করে এশিয়া এনার্জির সম্পৃক্ততা বাতিল, ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন না করা এবং স্থানীয় মানুষের সম্মতির বিষয়গুলো নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে।

তাদের দাবি, এশিয়া এনার্জি বর্তমানে নাম পরিবর্তন করে জিসিএম রিসোর্স নামে কার্যক্রম চালাচ্ছে। ফলে নতুন করে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের আলোচনা শুরু হওয়ায় পুরোনো আশঙ্কা আবারও সামনে এসেছে।

এদিকে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পর ২০০৬ সালের আন্দোলনের ছবি, নিহতদের স্মৃতি, পুরোনো সংবাদপত্রের কাটিং ও ছয় দফা চুক্তির বিভিন্ন অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে।

আন্দোলনকারীদের হুঁশিয়ারি

তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখার তৎকালীন সদস্য সচিব এসএম নুরুজ্জামান জামান বলেন, ২০০৬ সালের আন্দোলন ছিল দেশের প্রাণ-প্রকৃতি ও জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলন। তৎকালীন সরকারের সঙ্গে ছয় দফা চুক্তি হয়েছিল এবং উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, কোনো সরকার উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ নিলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আবারও আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখার আহ্বায়ক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম জুয়েল বলেন, ২০০৬ সালের আন্দোলনে তারা তিনজন সহযোদ্ধাকে হারিয়েছেন। তাই একই ধরনের উদ্যোগের কথা শুনে ফুলবাড়ীর মানুষ শঙ্কিত।

তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার করা না হলে আন্দোলনের মাধ্যমে ফুলবাড়ীর মাটি রক্ষার জবাব দেওয়া হবে।

এ পরিস্থিতিতে ১৯ আগস্ট রাতে গণসংহতি আন্দোলন ফুলবাড়ীতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে। সেখানে বক্তারা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগের বিরোধিতা করেন।

আতঙ্কে স্থানীয়রা

স্থানীয় বাসিন্দা জসিম উদ্দিন, শহিদুল ইসলাম ও জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তারা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের কোনো উদ্যোগ মেনে নেবেন না।

তাদের আশঙ্কা, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুধু কৃষিজমি ও বসতভিটাই নয়, মসজিদ, মন্দির, গোরস্থান, শ্মশান ও ঈদগাহসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে পানি, পরিবেশ ও মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে।

তারা বলেন, প্রয়োজনে আবারও আন্দোলন করবেন, কিন্তু ফুলবাড়ীকে ধ্বংস হতে দেবেন না।

পঙ্গুত্বের বোঝা নিয়ে বাবুল রায়

২০০৬ সালের আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন ফুলবাড়ীর সুজাপুরের বাবুল রায় (৫৩)। দুই দশক ধরে তিনি শয্যাশায়ী। শরীরের বিভিন্ন স্থানে পচন ধরেছে। অর্থের অভাবে তার দুই ছেলে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি; তারা এখন রাজমিস্ত্রির কাজ করে সংসার চালান।

বাবুল রায় বলেন, ব্যক্তিগত পাওয়া-না পাওয়া নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই। তবে মৃত্যুর আগে তিনি দেখতে চান—ছয় দফা চুক্তি বাস্তবায়ন হয়েছে, এশিয়া এনার্জি দেশ ছেড়েছে এবং আন্দোলনে নিহতদের পরিবার বিচার পেয়েছে।

নিহতদের পরিবারেরও ক্ষোভ

নিহতদের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, কিছু ক্ষতিপূরণ পাওয়া ছাড়া তাদের অধিকাংশ দাবি পূরণ হয়নি। আন্দোলনে নিহত বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্র তরিকুল ইসলামের বাবা মোকলেছার রহমান বলেন, ছেলের হত্যার বিচার এখনো পাননি তারা।

নিহত আমিনের বাবা আব্দুল হামিদ ও মা রেহেনা খাতুনও সন্তানের হত্যার বিচার না পাওয়ার আক্ষেপ করেন। নিহত সালেকিনের মা শেফালী বেগমের একটাই দাবি—ছেলে হত্যার বিচার।

তাদের অভিযোগ, আন্দোলনের সময় মামলা না করতে বলা হয়েছিল এবং সরকার মামলা করবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বিচারপ্রক্রিয়া এগোয়নি।

আবারও সামনে পুরোনো প্রশ্ন

ফুলবাড়ীর আন্দোলনের দুই দশক পূর্তিতে আবারও যখন উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের প্রসঙ্গ সামনে এসেছে, তখন স্থানীয়দের মধ্যে পুরোনো ভয় ও ক্ষোভ ফিরে এসেছে।

২৬ আগস্ট ফুলবাড়ীতে এক সমাবেশে তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ছয় দফা চুক্তি উপেক্ষা করে ফুলবাড়ীতে আবার কয়লার দিকে নজর দেওয়া হলে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।

তিনি বলেন, কয়লা উত্তোলনের নামে উত্তরাঞ্চলের পানি, জমি, জনবসতি ও পরিবেশ ধ্বংসের কোনো উদ্যোগ জনগণ গ্রহণ করবে না।

দুই দশক আগে যে আন্দোলনে প্রাণ দিয়েছিলেন তিনজন, আহত হয়েছিলেন শত শত মানুষ—সেই ফুলবাড়ীতেই এখন আবারও কয়লাখনি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ২০০৬ সালের ছয় দফা চুক্তির ভবিষ্যৎ কী এবং ফুলবাড়ীতে আদৌ নতুন করে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না—উত্তরের অপেক্ষায় স্থানীয়রা।

সর্বশেষ