• ২০২৬ নভেম্বর ০৪, বুধবার, ১৪৩৩ কার্তিক ২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০২:১১ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

আ.লীগের ইলিয়াস জাহাঙ্গীর ও কচির টাকায় গার্মেন্টসে অস্থিরতা

  • প্রকাশিত ০২:১১ অপরাহ্ন বুধবার, নভেম্বর ০৪, ২০২৬
আ.লীগের ইলিয়াস জাহাঙ্গীর ও কচির টাকায় গার্মেন্টসে অস্থিরতা
Time Bangla news
মোঃ মিজানুর রহমান | কুমিল্লা ব্যুরো চিফ প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ


আ.লীগের ইলিয়াস জাহাঙ্গীর ও কচির টাকায় গার্মেন্টসে অস্থিরতা

 প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ৮:৩০ পিএম

 ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে পোশাক কারখানার (গার্মেন্ট) শ্রমিকদের আন্দোলনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা অর্থায়ন করছেন বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। এসব নেতা তাদের কর্মী ও স্থানীয় নেতাদের দিয়ে রাজধানীর মিরপুর এলাকার গার্মেন্টগুলোর শ্রমিকদের নানাভাবে উসকে দিচ্ছে। জ্বালাও-পোড়াওতেও টাকা ঢালছেন তারা। গত রোববার মিরপুর এলাকায় পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ থেকে গ্রেপ্তার হওয়া আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের ২৬ জনকে গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য মিলেছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।

পুলিশের দাবি, মিরপুর-পল্লবী এলাকার আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ্, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক সময়ের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) জাহাঙ্গীর আলম মিরপুর এলাকায় তৈরি পোশাক শিল্পে অস্থিরতার জন্য টাকা ঢালছেন। তাদের মধ্যে কচি তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি ছিলেন। দুর্নীতির কারণে পিএসের পদ হারিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন জাহাঙ্গীর। পুলিশের এমন দাবির বিষয়ে জানতে কালবেলার পক্ষ থেকে ওই তিনজনের বক্তব্য নিতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। ২০২৫ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তারা আত্মগোপনে থাকায় কারও বক্তব্যই নেওয়া সম্ভব হয়নি।

গত রোববার গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলন থেকে মিরপুর ১১ নম্বরে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় মিরপুরের তিন থানায় পাঁচটি মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। মামলাগুলোতে আসামি করা হয়েছে অন্তত ১০ হাজার জনকে। মামলায় পুলিশের ওপর হামলা, ট্রাফিক পুলিশ বক্স ভাঙচুর, ককটেল বিস্ফোরণ ও সরকারি গাড়িতে আগুন দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলায় দুদিনে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের অন্তত ৫০ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করার কথা জানিয়েছে থানা ও গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাদের মধ্যে ২৬ জনকে রোববার এবং গতকাল সোমবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত আরও ২৪ জন গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তার হওয়া নেতাকর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদে নাশকতা ও অর্থায়নের নানা তথ্য পাওয়ার দাবি করেছেন ঢাকা মহানগরে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কর্মকর্তারা।

ডিবি সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও তাদের কাছ থেকে পাওয়া মোবাইল ফোন যাচাই করে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের ওই ৩ নেতা মিরপুর এলাকায় দলীয় নেতাকর্মীদের পোশাক শ্রমিক বেশে বিক্ষোভে অংশ নিতে বলেছেন। তারা এলাকায় আত্মগোপনে থাকা বিভিন্ন ওয়ার্ড ও থানা নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন নাশকতা চালিয়ে আন্দোলনকে উসকে দিতে। এজন্য গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের জন্য টাকাও বরাদ্দ করা হয়েছে। গাড়িতে বা কোনো স্থাপনায় আগুন দিলে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা, রাস্তায় টায়ারে আগুন দিলে ৩ হাজার টাকা, মিছিলে অংশ নিলে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে টাকা পাওয়ার প্রধান শর্ত হচ্ছে কাজের প্রমাণ হিসেবে ছবি ভিডিও পাঠানো। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কয়েকজন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এসব টাকা পেয়েছে।

ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে শ্রমিকদের সামনে রেখে নাশকতার পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। বিদেশে বসে বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপের মাধ্যমে বিজিএমইএ সাবেক সভাপতি এস এম মান্নান কচি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বরখাস্ত হওয়া ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলম ও মিরপুরের ঢাকা-১৬ (মিরপুর-পল্লবী) আসনের সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লাহ্নানা নির্দেশনা দিয়েছেন। ঢাকায় তাদের হয়ে লোকবল সংগ্রহ ও সমন্বয়ের কাজ করছেন ইলিয়াস মোল্লাহ্র ভাগ্নে আলিফ মোল্লা ও জাহাঙ্গীরের সহযোগী মাহবুবুর রহমান জুয়েল। তার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীতে। জুয়েল দীর্ঘদিন ধরে জাহাঙ্গীরের সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়াও এই তালিকায় রয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক শুভ ও মিরপুরের রূপনগর আওয়ামী লীগের সদস্য কামাল গাজী। তাদের মধ্যে জুয়েল ও কামাল গাজী রোববার মিরপুর ১২ নম্বর এলাকা থেকে ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। গ্রেপ্তার হওয়া এসব নেতাকর্মীর মোবাইল ফোনে বিদেশে পলাতক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও ছবি পাঠানোর প্রমাণ পেয়েছেন কর্মকর্তারা।

ডিবির হাতে গ্রেপ্তার ১১ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন গোয়েন্দা পুলিশের মিরপুর বিভাগের কর্মকর্তারা। এক কর্মকর্তা কালবেলাকে জানিয়েছেন, শ্রমিকদের আন্দোলনে যোগ দিয়ে নাশকতার উদ্দেশ্যে অন্তত এক থেকে দেড় শতাধিক নেতাকর্মীকে জড়ো করা হয়, যারা কক্সবাজার, নোয়াখালী, গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলার তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের পতনের পর নিজ এলাকা ছেড়ে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করে শ্রমিক ও দিনমজুর হিসেবে কাজ করছেন তারা। পাশাপাশি ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিলসহ নানা অপতৎপরতায় অংশ নিচ্ছেন। সাধারণ শ্রমিকের ছদ্মবেশে থাকলেও তারা অনলাইনে নিয়মিত নেতাদের নির্দেশনা পালন করছেন। তারা মিরপুর ২, ১০, ১১, ১২-সহ আশপাশের এলাকায় অবস্থান নেয়। পরবর্তী সময়ে গ্রুপের নির্দেশনা অনুযায়ী একস্থানে জড়ো হয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে যায়।

ডিবি জানায়, এ গ্রুপের প্রত্যেক নেতাকর্মী বিভিন্ন নামের অন্তত ৪ থেকে ৫টি গ্রুপে যুক্ত। ১১ জনের মোবাইলে বিভিন্ন অ্যাপসে নানা নামে অন্তত ২০ থেকে ২৫টি গ্রুপের সন্ধান পেয়েছেন গোয়েন্দারা, যেখানে গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলন অংশ নেওয়া নেতাকর্মীরা বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও পাঠিয়ে নিজেদের অবস্থান ও তৎপরতার জানান দিয়েছেন।

আলিফ মোল্লাকে খুঁজছে পুলিশ: রোববার মিরপুর-১০ নম্বরে শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে অনলাইন গ্রুপে একটি বার্তা পাঠান ইলিয়াস মোল্লার ভাগ্নে আলিফ মোল্লা। সব নেতাকর্মীকে মিরপুর ২ নম্বরের লাভ রোডে জড়ো হওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। নেতাকর্মীরা জড়ো হওয়ার পরে তাদের পাঠানো হয় মিরপুর ১১ নম্বর মেট্রোস্টেশনের নিচে। মিরপুরে পুলিশের সংঘর্ষে ব্যস্ত থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে মেট্রোস্টেশনের নিচে থাকা পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরে সেই ছবি ভিডিও পাঠানো হয় আলিফের কাছে। গতকাল গ্রেপ্তার হওয়া একাধিক আসামির মোবাইলে এমন তথ্য পেয়েছেন কর্মকর্তারা। পরে আলিফকে গ্রেপ্তারে একাধিক স্থানে অভিযান চালানো হয়। তবে তাকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।

গাড়ি পোড়ানোর স্বীকারোক্তির পোস্ট দিয়ে গ্রেপ্তার যুবক: রাজধানীর মিরপুরে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন চলাকালে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় জড়িত থাকার স্বীকারোক্তি দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ায় রাজিব চন্দ্র দাস নামে এক তরুণকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সোমবার রাতে উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে উত্তরা পশ্চিম থানা। পরে তাকে পল্লবী থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। গ্রেপ্তার রাজিব প্যারাগন গ্রুপের ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতেন। তিনি শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলা ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তার বিরুদ্ধে গাড়ি পোড়ানোর ছবি ও ভিডিও বিভিন্ন নেতাকে পাঠানোর তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পল্লবী থানা পুলিশ। গত রোববার থানা পুলিশ ও ডিবির হাতে গ্রেপ্তার ২৬ জনকে আদালতে তিন মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে গতকাল সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তোলা হয়। এর মধ্যে পল্লবী থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা একটি মামলায় ১৩ জন, বিস্ফোরক দ্রব্য আইন ও দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় করা পল্লবী থানায় আরেকটি মামলায় ৭ জন এবং মিরপুর মডেল থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় ৬ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। গতকাল আদালতে তোলার পর শুনানি শেষে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এদিকে তৃতীয় দিনের মতো গতকালও একই দাবিতে মিরপুরে রাস্তা অবরোধের চেষ্টা করেন শ্রমিকরা। তবে তাদের নামতে বাধা দেয় পুলিশ। দুই দফায় আন্দোলনকারীরা সড়কে নামার চেষ্টা করলে তাদের ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দেয় পুলিশ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার আবু নাসের রিকাবদার বলেন, পুরো বিষয়টি তারা তদন্ত করছেন। যাচাই-বাছাই করে আরও কয়েকটি মামলার প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি জড়িতদের গ্রেপ্তারেও অভিযান চলছে।

ডিএমপি যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম ও প্রিভেনশন উত্তর) মো. মহিদুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের সঙ্গে দুষ্কৃতিকারী রয়েছে। যারা আইন অমান্য করছে, আইন লঙ্ঘন করছে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি করতে চাচ্ছে বা করছে, তারা আমাদের দৃষ্টিতে অপরাধী। আমরা তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছি।

এদিকে শ্রমিকদের সামনে রেখে নাশকতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গতকাল সচিবালয়ে গার্মেন্টস মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি বলেন, যারা শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এবং দেশে অস্থিরতা ও সহিংসতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। কিছুদিন ধরে পতিত স্বৈরাচারের পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত কিছু পক্ষ নিরীহ শ্রমিকদের ব্যবহার করে সড়ক-মহাসড়কে আগুন জ্বালিয়ে ও অবরোধ সৃষ্টি করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। অথচ প্রকৃত শ্রমিক ও তাদের সংগঠনের নেতারা কখনোই নিজেদের কর্মসংস্থান বিনষ্ট হোক বা শিল্পকারখানায় অস্থিতিশীলতা তৈরি হোক, তা চান না। তিনি বলেন, সহিংসতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত চিহ্নিত ইন্ধনদাতা এবং কয়েকজন শিল্পমালিককে এরই মধ্যে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। অডিও-ভিডিও প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


সর্বশেষ