*আসাদুজ্জামান নূরের বিরুদ্ধে হত্যা মামলায় প্রমাণ কোথায়, প্রশ্ন বার্গম্যানের।*
সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূরের ৮০তম জন্মদিন উপলক্ষে কয়েকটি চমৎকার গণমাধ্যমে ইতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশের সমালোচনা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির এমন অবস্থানের পর নূরের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক হত্যা মামলার অভিযোগ ও কারাবন্দি রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে বার্গম্যান দাবি করেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে আসাদুজ্জামান নূরের সরাসরি সম্পৃক্ততার কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি। তার অভিযোগ, পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
সম্প্রতি আসাদুজ্জামান নূরের জন্মদিন উপলক্ষে প্রতিবেদন প্রকাশ করায় মাছরাঙা টেলিভিশনসহ কয়েকটি গণমাধ্যমের সমালোচনা করে বিবৃতি দেয় এনসিপি। দলটির দাবি, আওয়ামী লীগের সাবেক এই সংসদ সদস্য আন্দোলনকারীদের হত্যা ও দুর্নীতির অভিযোগে কারাগারে রয়েছেন। তাকে সাবেক সরকারের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করে এনসিপি বলেছে, ইতিবাচকভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে গণমাধ্যমগুলো ফ্যাসিবাদকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে।
এনসিপির বক্তব্যের সমালোচনা করে বার্গম্যান বলেন, হত্যা মামলায় আসাদুজ্জামান নূরকে দীর্ঘদিন ধরে আটক রাখা হলেও তার বিরুদ্ধে সরাসরি অপরাধে অংশগ্রহণের প্রমাণ জনসমক্ষে উপস্থাপন করা হয়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো ভিডিও ফুটেজ, আপত্তিকর ফোনালাপ, স্বীকারোক্তি কিংবা কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) প্রকাশ করা হয়নি, যা হত্যাকাণ্ডে নূরের সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে।
বাড্ডা থানায় দায়ের করা একটি হত্যা মামলার অভিযোগপত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই সাংবাদিক। তার দাবি, ওই অভিযোগপত্রেও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নূরের সরাসরি সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। এ বিষয়ে প্রথম আলোতে প্রকাশিত নিজের সাম্প্রতিক একটি নিবন্ধের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
বার্গম্যানের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই গ্রেপ্তার ও দীর্ঘদিন কারাগারে রাখার ঘটনা ঘটছে। পুলিশি তদন্ত এবং নিম্ন আদালতের আটকসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে যাচাই করা হচ্ছে কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
এনসিপির বিবৃতিকে কেন্দ্র করে বার্গম্যানের বক্তব্য, এতে এমন একটি বিচারিক ব্যবস্থার প্রতি সমর্থনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যেখানে অপরাধের পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই কাউকে দীর্ঘদিন কারাগারে রাখা সম্ভব। তার মতে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলেই তাকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যায় না।
দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বার্গম্যান। তিনি দাবি করেন, আসাদুজ্জামান নূরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হলেও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা করেনি। ফলে তার বিরুদ্ধে ‘নজিরবিহীন দুর্নীতির’ অভিযোগের ভিত্তি কী, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নূরকে ‘ফ্যাসিবাদের সাংস্কৃতিক স্তম্ভ’ হিসেবে এনসিপির আখ্যায়নেরও সমালোচনা করেন বার্গম্যান। তার মতে, এ ধরনের মন্তব্যে নূরের দীর্ঘ অভিনয়জীবন ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তার অবস্থানকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। ১৯৭২ সাল থেকে অভিনয়জগতে সক্রিয় থাকা নূর বিএনপির আগের শাসনামলেও জনপ্রিয় টেলিভিশন অভিনেতা ছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে এনসিপি তাদের বিবৃতিতে বলেছে, জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা শহীদদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা এবং তাদের পরিবারের জন্য অপমানজনক। একই সঙ্গে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অপরাধ আড়াল বা খাটো করে দেখানোর প্রবণতা থেকে গণমাধ্যমগুলোকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে দলটি। এ জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি গণমাধ্যম কমিশন গঠনের দাবিও জানিয়েছে তারা।
তবে এনসিপির এই বক্তব্যের সমালোচনা করে বার্গম্যানের অভিযোগ, অপর্যাপ্তভাবে প্রমাণিত রাজনৈতিক ও ফৌজদারি অভিযোগ প্রতিষ্ঠায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের শোককে সামনে আনা হচ্ছে। তার মতে, আওয়ামী লীগ সরকারও অতীতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে অভিযোগের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রসঙ্গ ব্যবহার করত। একই ধরনের রাজনৈতিক চর্চা ফিরে এলে তা হবে দুঃখজনক।
বার্গম্যানের মতে, আসাদুজ্জামান নূরকে কারাগারে রাখার ক্ষেত্রে বিএনপি সরকারের দায় রয়েছে। তবে নির্বিচারে আটকের যে নীতি সরকার অনুসরণ করছে, এনসিপি তার প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
তিনি বলেন, জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কাউকে বিচারের মুখোমুখি করতে হলে হত্যাকাণ্ড বা হত্যাচেষ্টার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকতে হবে। তা না থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়া উচিত।
উল্লেখ্য, বার্গম্যানের বক্তব্য মূলত প্রকাশ্যে আসা তথ্য ও মামলার নথি নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ। তদন্তকারীদের হাতে অপ্রকাশিত কোনো প্রমাণ রয়েছে কি না, তা এ বক্তব্যের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় না। একইভাবে কোনো অভিযোগপত্রে তথ্যের উল্লেখ না থাকা এবং আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া এক বিষয় নয়। ফলে নূরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তদন্তে পাওয়া তথ্য এবং বিচারিক সিদ্ধান্তকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
মতামত দিন