• ২০২৬ নভেম্বর ০৪, বুধবার, ১৪৩৩ কার্তিক ২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০২:১১ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

*সাগরে শৈবাল চাষে ভাগ্যবদল মরিয়মের, কর্মসংস্থান ৬০ নারীর।

  • প্রকাশিত ০২:১১ অপরাহ্ন বুধবার, নভেম্বর ০৪, ২০২৬
*সাগরে শৈবাল চাষে ভাগ্যবদল মরিয়মের, কর্মসংস্থান ৬০ নারীর।
Time Bangla news
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ।

*সাগরে শৈবাল চাষে ভাগ্যবদল মরিয়মের, কর্মসংস্থান ৬০ নারীর।* 

 *উপশিরোনাম:* একসময় সন্তানদের মুখে ভাত তুলে দিতে পারতেন না, সেই মরিয়মই এখন ৫০০ নারীর স্বপ্নসারথি।

একসময় সংসারে খাবার জুটত না নিয়মিত। সাত সন্তানকে নিয়ে অভাবের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হতো। কখনো এক মুঠো ভাত কম পড়ত, কখনো কাটাতে হতো উপোসে। অথচ সেই দুর্দিন পেরিয়ে আজ নিজের ভাগ্য বদলানোর পাশাপাশি এলাকার শত শত মানুষের জীবনে আশার আলো জ্বালিয়েছেন কক্সবাজারের মরিয়ম বেগম। সমুদ্রের বুকে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ করে তিনি এখন একজন সফল উদ্যোক্তা। তাঁর হাত ধরে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে বহু নারীর।

কক্সবাজারের উত্তর নুনিয়ারছড়ার পানিরকূপ পাড়ার বাসিন্দা মরিয়ম। স্বামী নুরুল আলম ছিলেন ভ্যানচালক। তাঁর সামান্য আয়ে নয় সদস্যের সংসার চালানো ছিল কঠিন। সন্তানদের লেখাপড়া, পোশাক কিংবা পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। সংসারের অভাব ঘোচাতে একসময় সৈকত থেকে শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করে মালা, চুড়িসহ নানা শৌখিন সামগ্রী তৈরি করে বিক্রি করতেন তিনি।

সেই সংগ্রামী জীবনের মোড় ঘুরে যায় ২০১৬ সালে। একদিন সৈকতে শামুক সংগ্রহ করতে গিয়ে কয়েকজন গবেষককে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ করতে দেখেন মরিয়ম। তাঁরা ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক। কৌতূহল থেকে দীর্ঘ সময় তাঁদের কাজ পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। পরে গবেষকদের কাছ থেকে শৈবাল সংগ্রহ ও চাষের পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা নেন। ধীরে ধীরে বিষয়টির প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে তাঁর।

তবে নতুন উদ্যোগে শুরুতেই বাধা আসে। স্বামীও প্রথম দিকে তাঁকে সহযোগিতা করতে চাননি। কিন্তু অভাব থেকে বেরিয়ে আসার প্রবল ইচ্ছা আর গবেষকদের উৎসাহে পিছিয়ে যাননি মরিয়ম। মাত্র ১০টি রশি দিয়ে শুরু করেন সামুদ্রিক শৈবাল চাষ। পরের বছর রশির সংখ্যা বাড়িয়ে করেন ২০টি। উৎপাদন ও বিক্রি বাড়তে থাকায় একসময় স্বামীও তাঁর কাজে সহযোগিতা শুরু করেন।

সেই ছোট উদ্যোগ এখন অনেক বড় হয়েছে। বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৩৫০টি রশিতে শৈবাল চাষ করছেন মরিয়ম। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি রশি থেকে গড়ে ৮ থেকে ১০ কেজি কাঁচা শৈবাল পাওয়া যায়। শুকানোর পর এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় এক কেজি। বছরে ২০০ থেকে ৩০০ কেজি শুকনো শৈবাল বিক্রির পাশাপাশি কাঁচা শৈবালও বাজারজাত করেন তিনি।

শুরুর দিকে উৎপাদিত শৈবাল বিক্রি করতে স্বামীকে বান্দরবান, আলীকদম, খাগড়াছড়ি ও মিরসরাইয়ের মতো এলাকায় যেতে হতো। পাহাড়ি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ ছিলেন তাঁদের প্রধান ক্রেতা। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মরিয়মের উদ্যোগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে তাঁর কাজ নিয়ে আলোচনা শুরু হলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সরাসরি ক্রয়াদেশ আসতে থাকে।

মরিয়ম বলেন, এখন ঘরে বসেই অর্ডার পান। আগের মতো পণ্য নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরতে হয় না। উৎপাদিত শৈবালের প্রায় সবটুকুই বিক্রি হয়ে যায়।

 *মৌসুমভিত্তিক চাষ, সম্ভাবনা বড়* 

সামুদ্রিক শৈবাল চাষের জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিবেশ ও পরিচর্যা। ছোট ছোট শৈবাল নির্দিষ্ট দূরত্বে রশির সঙ্গে বেঁধে সাগরের পানিতে ভাসিয়ে রাখা হয়। প্রায় ২২ দিন পর প্রথমবার শৈবাল সংগ্রহ করা যায়। এরপর প্রতি ১৪ থেকে ১৫ দিন অন্তর একই রশি থেকে কয়েক দফায় ফসল তোলা সম্ভব।

তবে বাংলাদেশের উপকূলে সারা বছর এই চাষ করা যায় না। শৈবালের ভালো উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত লবণাক্ততা ও স্বচ্ছ পানি। বর্ষায় নদী থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ বাড়লে সমুদ্রের লবণাক্ততা কমে যায়। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়। সাধারণত অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত কক্সবাজার উপকূলে শৈবাল চাষের মৌসুম চলে।

চাষের জন্য পানির গভীরতা, স্রোত, লবণাক্ততা এবং রশির গুণগত মানও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন পানিতে থাকলে রশির কার্যকারিতা কমে যায়। তাই ভালো ফলনের জন্য প্রতিটি মৌসুমে নতুন রশি ব্যবহার করতে হয়।

মরিয়ম মূলত 'উলভা' ও 'গ্র্যাসিলারিয়া' জাতের শৈবাল চাষ করেন। এর মধ্যে উলভা জাতের শুকনো শৈবাল প্রতি কেজি প্রায় এক হাজার টাকায় বিক্রি হয়। অন্যদিকে গ্র্যাসিলারিয়ার দাম কেজিপ্রতি ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা।

বর্তমানে তাঁর উৎপাদিত শৈবাল কক্সবাজারের গণ্ডি পেরিয়ে ঢাকা, রাজশাহী, সিলেট, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাচ্ছে। কক্সবাজারের কয়েকটি পাঁচতারা হোটেল, রিসোর্ট ও গবেষণাকেন্দ্রেও সরবরাহ করা হচ্ছে এসব পণ্য।

 *নিজে বদলেছেন, বদলাচ্ছেন অন্যদের জীবনও* 

মরিয়মের সাফল্যের সবচেয়ে বড় দিক শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক পরিবর্তন নয়; বরং অন্য নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। বর্তমানে তাঁর উদ্যোগে কাজ করছেন ৭৭ জন কর্মী। তাঁদের মধ্যে ৬০ জনের বেশি নারী। এ ছাড়া এলাকার প্রায় ৫০০ মানুষকে সামুদ্রিক শৈবাল চাষের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি। তাঁর কাছ থেকে কাজ শিখে অনেকেই এখন নিজের উদ্যোগে চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।

মরিয়মের ভাষায়, তিনি যা শিখেছেন, তা নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। এলাকার অন্য নারীরাও যেন পরিবার নিয়ে ভালোভাবে চলতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই তাঁদের বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

এই উদ্যোগের স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। চলতি বছরের ১৫ মে দেশের অন্যতম শিল্পগোষ্ঠী আবুল খায়ের গ্রুপ তাঁকে 'এম-রাইজ হিরো' সম্মাননায় ভূষিত করে। সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা ছয়জনের একজন হিসেবে এই স্বীকৃতি পান মরিয়ম।

তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম। প্রতিদিন ছয় ঘণ্টারও বেশি সময় তাঁকে সাগরে কাটাতে হয়। জেলেদের ফেলে যাওয়া জাল, সাগরের তীব্র স্রোত ও ভেসে আসা আবর্জনা থেকে শৈবাল রক্ষা করতে নিয়মিত পরিচর্যা করতে হয়।

মরিয়ম জানান, একসময় তাঁর হাতে কোনো পুঁজি ছিল না। শূন্য হাতে শুধু চেষ্টা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তাদের সহযোগিতা না পেলে এত দূর এগোনো কঠিন হতো বলেও মনে করেন তিনি।

আজ তাঁর চার মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছোট সন্তানদের লেখাপড়া করাচ্ছেন। সংসারে ফিরেছে সচ্ছলতা, গড়ে তুলেছেন নিজের থাকার ভালো ব্যবস্থা। যে নারী একসময় সন্তানদের তিন বেলা খাবার দিতে হিমশিম খেতেন, তিনিই এখন অন্যদের জীবিকা অর্জনের পথ দেখাচ্ছেন।


প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ না পেলেও আত্মবিশ্বাস ও অভিজ্ঞতায় নিজেকে এগিয়ে নিয়েছেন মরিয়ম। একসময় মানুষের সামনে কথা বলতে সংকোচ বোধ করতেন। এখন বিভিন্ন জায়গায় তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, নিজের কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

তাঁর বিশ্বাস, সাহস, ধৈর্য ও পরিশ্রম থাকলে প্রতিকূলতার মধ্যেও ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। সাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে মরিয়মের এই এগিয়ে চলা তাই শুধু একজন নারীর ভাগ্যবদলের গল্প নয়; উপকূলের নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান ও আত্মনির্ভরতার সম্ভাবনারও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

সর্বশেষ