*মানুষের কণ্ঠের বাজারে এআইয়ের দাপট, পেশা হারানোর শঙ্কায় শিল্পীরা।*
একসময় বিজ্ঞাপন, ডকুমেন্টারি, নাটক কিংবা ভিডিওর জন্য কণ্ঠশিল্পীদের ওপরই নির্ভর করতে হতো নির্মাতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিস্তারে বদলে যাচ্ছে সেই বাস্তবতা। এখন কয়েকটি নির্দেশনা ও সফটওয়্যারের সাহায্যেই তৈরি হচ্ছে বাংলা ভয়েসওভার। কম খরচে ও অল্প সময়ে কনটেন্ট তৈরির সুযোগ থাকায় এআই কণ্ঠের দিকে ঝুঁকছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রা একদিকে কাজ সহজ করছে, অন্যদিকে অনিশ্চয়তায় ফেলছে পেশাদার ভয়েস আর্টিস্টদের। কমে যাচ্ছে কাজের সুযোগ, বাড়ছে পারিশ্রমিক নিয়ে দরকষাকষি। পাশাপাশি অনুমতি ছাড়া কণ্ঠস্বর ব্যবহারের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি একটি পরিচিত বাংলাদেশি ব্র্যান্ডের কাজ করতে গিয়ে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন ভয়েস আর্টিস্ট লাবণ্য লুবনা। প্রতিষ্ঠানটির জন্য তিনি আগেভাগেই কণ্ঠ রেকর্ড করেছিলেন। কিন্তু পারিশ্রমিকের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে জানতে পারেন, কর্তৃপক্ষ কাজটি এআই ভয়েস দিয়ে করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরে অবশ্য তার রেকর্ড করা কণ্ঠই ব্যবহার করা হয়।
লাবণ্যের মতে, একজন মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা সহজ হলেও একটি সফটওয়্যারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ভিন্ন বাস্তবতা। কারণ এআই ক্লান্ত হয় না, সময়ের সীমাবদ্ধতা নেই, আবার মানুষের মতো পারিশ্রমিকও দাবি করে না।
*খরচ কমাতে এআইয়ের দিকে ঝুঁকছে প্রতিষ্ঠান*
ভয়েসওভার শিল্পীদের মতে, এআইয়ের জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ সময় ও ব্যয় সাশ্রয়। একজন শিল্পীকে দিয়ে কাজ করাতে পারিশ্রমিক ও সময়সূচির বিষয় থাকে। অন্যদিকে এআই সাবস্ক্রিপশন থাকলে দ্রুতই প্রয়োজনীয় কণ্ঠ তৈরি করা সম্ভব।
কণ্ঠশিল্পী তানিম রহমান মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় এআইয়ের ব্যবহারও বাড়ছে। বিশেষ করে ছোট অনলাইন ব্যবসা ও স্বল্প বাজেটের বিজ্ঞাপনে তথ্য পৌঁছে দেওয়াই যেখানে মূল লক্ষ্য, সেখানে মানবকণ্ঠের পরিবর্তে এআই ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞাপন ও ব্র্যান্ড কনটেন্টে এখনো মানবকণ্ঠের চাহিদা রয়েছে বলে জানান শিল্পীরা।
*কাজ কমছে, কমছে পারিশ্রমিকও*
লাবণ্যের অভিজ্ঞতায়, ২০২৪ সালের দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট এআই কণ্ঠ ব্যাপক জনপ্রিয় হওয়ার পর ভয়েস আর্টিস্টদের কাজ কমতে শুরু করে। বিশেষ করে কয়েকজন পুরুষ শিল্পী তাকে সরাসরি কাজ কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
তানিম রহমানও মনে করেন, এআইয়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নতুন ও এন্ট্রি-লেভেলের শিল্পীদের ওপর। তার পরিচিত একজন শিল্পীর উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, আগে শুধু ভয়েসওভারের কাজ করে মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব হলেও এখন একই ব্যক্তি দুই থেকে তিন হাজার টাকা আয় করতেও সমস্যায় পড়ছেন।
লাবণ্য জানান, ৩০ সেকেন্ডের একটি কাজের জন্য তিনি এক হাজার টাকা চাইলে কোনো কোনো ক্লায়েন্ট এআই দিয়ে ৩০০ টাকায় কাজ করানোর কথা বলেন।
তবে এ সংকটের জন্য শুধু এআইকে দায়ী করতে চান না তিনি। তার মতে, প্রশিক্ষণ ছাড়াই কম পারিশ্রমিকে কাজ শুরু করার প্রবণতা আগে থেকেই বাজারে সম্মানির ওপর চাপ তৈরি করেছিল। এআই আসার পর সেই প্রতিযোগিতা আরও বেড়েছে।
কণ্ঠশিল্পী আহমেদ ইমতিয়াজ সাব্বিরের মতে, দেশের ভয়েসওভার ও ডাবিং শিল্পে শিল্পীদের যথাযথ সম্মানী, পেশাগত অধিকার ও কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।
*আবেগ ও অভিনয়ে এখনো এগিয়ে মানবকণ্ঠ*
এআই দ্রুত ও কম খরচে ভয়েস তৈরি করতে পারলেও মানুষের অভিনয় ও আবেগ প্রকাশের জায়গায় এখনো সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে মনে করেন শিল্পীরা।
ভয়েস আর্টিস্ট দীপ্ত কর্মকার জানান, এআই দিয়ে দ্রুত কনটেন্ট তৈরি করা গেলেও ভালো পারফরম্যান্সের প্রয়োজন হলে অনেক ক্লায়েন্ট আবার মানবকণ্ঠের কাছে ফিরছেন। তার মতে, একটি গল্প শুধু পড়ে শোনানো নয়, সেটিকে আবেগ ও অভিনয়ের মাধ্যমে উপস্থাপন করাও গুরুত্বপূর্ণ।
কণ্ঠশিল্পী নিলয় নীলের মতে, তথ্যভিত্তিক সাধারণ ন্যারেশনে এআই কার্যকর হতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞাপন, কার্টুন কিংবা গল্প বলার ক্ষেত্রে ভয়, আনন্দ, উত্তেজনা ও চরিত্রের পরিবর্তন ফুটিয়ে তুলতে মানবকণ্ঠের বিশেষ দক্ষতা প্রয়োজন।
ডাবিং শিল্পী আহমেদ ইমরিয়াজ সাব্বিরও মনে করেন, ডাবিং শুধু সংলাপ পড়া নয়। মূল অভিনয়শিল্পীর আবেগ, মুখের অভিব্যক্তি ও ঠোঁটের নড়াচড়ার সঙ্গে কণ্ঠের সামঞ্জস্য রাখতে হয়। এসব ক্ষেত্রে মানুষের অভিনয় গুরুত্বপূর্ণ।
*অনুমতি ছাড়া কণ্ঠ ক্লোনিংয়ের ঝুঁকি*
এআইয়ের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো ভয়েস ক্লোনিং। এর মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির কণ্ঠের নমুনা ব্যবহার করে তার মতো কৃত্রিম কণ্ঠ তৈরি করা সম্ভব।
লাবণ্য জানান, একাধিকবার তাকে নিজের কণ্ঠ ক্লোন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো প্রস্তাবে ছয় বা সাত অঙ্কের পারিশ্রমিকের কথাও ছিল। কিন্তু কণ্ঠের ভবিষ্যৎ ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ থাকায় তিনি রাজি হননি।
তার পরিচিত একজন শিল্পী এমন একটি কনটেন্টে নিজের কণ্ঠ শুনেছেন, যার জন্য তিনি কোনো রেকর্ডিং করেননি। এতে অনুমতি ছাড়া কণ্ঠ ব্যবহারের ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
লাবণ্যের মতে, সম্মতি নিয়ে কণ্ঠ ক্লোন করা হলে শিল্পী চুক্তির মাধ্যমে পারিশ্রমিক ও ব্যবহারের শর্ত নির্ধারণ করতে পারেন। কিন্তু অনুমতি ছাড়া কণ্ঠ ব্যবহার হলে তার কিছু করার থাকে না।
এ কারণে ভয়েস আর্টিস্টদের কণ্ঠস্বরের অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছেন তিনি। এ বিষয়ে কপিরাইট অফিসে যোগাযোগ করলেও এখনো চূড়ান্ত সমাধান পাওয়া যায়নি বলে জানান লাবণ্য।
*প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহকারী হিসেবে এআই?*
প্রযুক্তির এই পরিবর্তনকে কেউ দেখছেন হুমকি হিসেবে, কেউ সম্ভাবনা হিসেবে। দীপ্ত কর্মকার এআইকে প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহারের পক্ষে। তার মতে, স্ক্রিপ্টের প্রাথমিক প্রস্তুতি কিংবা তথ্য সংগ্রহে এআই কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে চূড়ান্ত পরিবেশনা ও সৃজনশীলতার জায়গায় শিল্পীর দক্ষতাই প্রধান।
তানিম রহমানও প্রযুক্তির ব্যবহারকে ইতিবাচকভাবে দেখেন। তবে নিজের চিন্তা ও গবেষণার জায়গাটি পুরোপুরি এআইয়ের ওপর ছেড়ে দেওয়ার বিপক্ষে তিনি।
অন্যদিকে নিলয় নীল মনে করেন, পরিবর্তিত বাজারে টিকে থাকতে শিল্পীদের শুদ্ধ উচ্চারণ, আবেগ প্রকাশ, অভিনয় ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ক্লায়েন্টের সঙ্গে যোগাযোগ, পারিশ্রমিক নির্ধারণ এবং নিজের কাজের বিপণনেও দক্ষ হওয়া জরুরি।
আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে ভয়েসওভার শিল্পে মানবকণ্ঠের অবস্থান কোথায় দাঁড়াবে, তা নিয়ে নিশ্চিত নন কেউই। তবে শিল্পীদের ধারণা, তথ্যভিত্তিক সাধারণ কনটেন্টে এআইয়ের ব্যবহার বাড়লেও ডাবিং, অভিনয়, গল্প বলা ও আবেগঘন পরিবেশনায় মানুষের প্রয়োজনীয়তা থাকবে।
প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা থামানো সম্ভব নয়। তবে এই পরিবর্তনের মধ্যে শিল্পীদের ন্যায্য পারিশ্রমিক, কণ্ঠস্বরের মালিকানা ও অনুমতি ছাড়া ভয়েস ক্লোনিংয়ের বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
মতামত দিন